আবহাওয়া দক্ষিণবঙ্গ শিক্ষা লাইফ স্টাইল স্বাস্থ্য ভ্রমন ধর্ম কৃষি কাজ ক্রাইম

স্বর্ণাঙ্গুরিয় পেশাদার যাত্রাভিনেতা প্রদীপ রুজ

krishna Saha

Published :

Jatra-pala
WhatsApp Channel Join Now

শক্তি চট্টোপাধ্যায়:- বীরভূম জেলায় বহু বহু বীরের জন্ম । বীরভূম জেলার শান্তিনিকেতন রবীন্দ্র-গন্ধে ভরপুর । বীরভূম জেলার সিউড়ির মোরব্বা জগৎ বিখ্যাত মিষ্টান্ন । সেই বীরভূম জেলার সিউড়ির বাজারপাড়ায় ১৯৬১ সালের ১৪ই নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন আজকের খ্যাতনামা যাত্রাভিনেতা প্রদীপ রুজ । বাবার নাম স্বর্গীয় শ্যামাপদ রুজ । মায়ের নাম স্বর্গীয়া নিয়তি রাণী রুজ পশ্চিমবঙ্গ। শৈশবে পড়াশুনা স্থানীয় পাঠশালায় । মাধ্যমিক পাশ করেন ১৯৭৭ সালে সিউড়ি শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠ থেকে । সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে স্নাতক হন । সংসার ভীষণ অভাব থাকায় পড়াশুনা আর উঁচুতে পৌঁছায়নি । ঝাঁক ঝাঁক অভাব ঝাঁপ দিয়েছে বলিষ্ঠ অভিনেতা মাননীয় প্রদীপ রুজের উঠোনে । অভাবের কৈলাস পর্বতের বেষ্টন ভাঙতে হোটেলে কাজ নেন আজকের প্রবীণ জনপ্রিয় অভিনেতা ।

মূলতঃ দুর্ধর্ষ খলনায়ক হিসেবেই প্রসিদ্ধ অভিনেতা প্রদীপবাবু । কৈশোরে ছাত্রাবস্থায় নবম শ্রেনীতে পাঠকালীন প্রথম অভিনয় ‘কিপটে ঠাকুরদা’ নাটকে । ১৯৭৭ সালে ওই স্কুলেই পড়াকালীন ‘বিনয় বাদল দীনেশ’ নাটকে অভিনয় করেন । ছাত্রজীবনেই ‘আনন’ নাট্য সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হন এই বিখ্যাত অভিনেতা । আজও অভিনেতা তাঁর এই প্রিয় সংস্থাটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন । নিজের স্কুলের শিক্ষক মাননীয় সুকুমার রায়ের মাধ্যমে সাঁইথিয়ার দেবপুর গ্রামে একটি যাত্রায় অভিনয় করেন । যাত্রার সেই অভিনয় স্থানীয় যাত্রামোদী মানুষজনদের অবাক করে দেয় । চারিদিকে অভিনেতা মাননীয় প্রদীপ রুজের নাম ছড়িয়ে পড়ে । কলকাতা সুবিখ্যাত অপেরাগুলোতে ডাক পেতে শুরু করেন । সুবিখ্যাত জনপ্রিয় যাত্রাভিনেতা ১৯৮৩ সালে তরুণ অপেরায় কিংবদন্তি নির্দেশক-অভিনেতা শান্তিগোপাল মহাশয়ের নির্দেশনায় ‘বিশ্বত্রাস হিটলার’, ‘টিপু সুলতানের তরবারি’, ‘রাজরক্ত’ যাত্রাপালায় অভিনয় করেন ।

সে ছিল যাত্রার স্বর্ণযুগ । যাত্রাপালা তখন মেঘমালায় যজ্ঞেশ্বর । তারপর ১৯৮৪-৮৫ সালে সত্যম্বর অপেরায় ভৈরবনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় ‘দেবী সন্ন্যাসিনী’, ‘এক লক্ষ্মীর মন্দির’ যাত্রাপালায় অভিনয় করেন । সত্যপ্রকাশ দত্ত রচিত, বিশ্বনাথবাবু নির্দেশিত ‘অভিমান’, ‘রাজযোটক’ পালাতেও অভিনয় করে ভীষণ প্রশংসিত হয়েছিলেন । কিন্তু ভাগ্য যাঁর দুঃখের মরুভূমির সঙ্গী হয়, তাঁর নৌকার মাস্তুলও চুপ মেরে থাকে । পারিবারিক মহা সমস্যায় পড়েন অভিনেতা প্রদীপবাবু । কলকাতার যাত্রাজীবন ছেড়ে ফিরে আসতে হয় ঘরে । ঘরে ফিরেই একটি হোটেলে সামান্য টাকার চাকুরি নেন অভিনেতা । কিন্তু সেখানেও ভাগ্য পাক দিয়ে পাক ঘোরান প্রদীপবাবুকে । হোটেল লোকসানে চলছে এই অজুহাতে মালিক আচমকা হোটেল বন্ধ করে দেন । কাজ হারিয়ে ফের কাজের খোঁজ শুরু করতে থাকেন । কয়েক দিনের মধ্যে একটি লজে কাজ জুটে যায় । কিছুদিন কাজ করবার পর মালিকের দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেন অভিনেতা ।

See also  লাদাখের ভারত-চীনে সেনা সংঘর্ষে শহিদ বীরভূমের বীরসন্তান রাজেশ ওরাং

সেখানেও মালিকের দুর্ব্যবহারে কাজ ছাড়তে বাধ্য হন । যেমন চোখ অন্ধ করার ধূলিরাশি প্রদীপবাবুর পিছনে পিছনে ধাবমান হয় । অবশেষে পশ্চিম বর্ধমানের সন্দীপ ভাণ্ডারীর সঙ্গে সূত্র ধরে যোগাযোগ হয় । ২০০৩ সাল থেকে শুরু হয় জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস । এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি আজকের প্রখ্যাত যাত্রাভিনেতা প্রদীপ রুজকে । প্রবীণ অভিনেতার শরীরে কোনও বয়সের ছাপ নেই । দীর্ঘ সুন্দর চেহারা । অসাধারণ কণ্ঠের জোর । হাসিতে গালে টোল পড়ে । খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করলেও বাস্তব জীবনে ভীষণ কোমল হৃদয় অভিনেতার । ব্যবহার অত্যন্ত মধুর । সকলকে সহজেই আপন করে নিতে পারেন । তবে অনর্থক কাউকে তোষামোদ করা তাঁর চরিত্র বিরোধী । সুবিধা নিতে তৈলমর্দনকে ঘৃণা করেন । স্পষ্টবাদী মানুষ অভিনেতা প্রদীপ রুজ ।

আশির দশক থেকে আজ অবধি বহু বহু সম্মাননীয় প্রযোজকদের প্রযোজিত যাত্রাপালায় অভিনয় করেছেন বলিষ্ঠ যাত্রাভিনেতা প্রদীপ রুজ । বিশিষ্ট কয়েকজন প্রযোজক হলেন : পীযূষ বিশ্বাস, প্রদীপ চ্যাটার্জী তাপসী রায় চৌধুরী, উল্কা রায়, সমীর সেন, উত্তম মাইতি, সুব্রত মুখার্জী, কনক ভট্টাচার্য্য, নেপাল সরকার, মুকুন্দ মাইতি, গৌতম নন্দী, আশীষ প্রামানিক, অচিন্ত্য মুখার্জী, দিলীপ মাপারু, নুপূর চ্যাটার্জী, তরুণ দলুই, অশোক দাস, রাহুল মিশ্র ইত্যাদি । মাননীয় অভিনেতা প্রদীপবাবু এ-যাবৎ যাঁদেরকে নির্দেশক হিসেবে পেয়েছেন সেই সমস্ত সম্মাননীয় নির্দেশকদের মধ্যে অন্যতম কয়েকজন হলেন : নির্মল মুখার্জী, ত্রিদিব ঘোষ, তপন গাঙ্গুলী, অনল চক্রবর্ত্তী, অমিতাভ ভট্টাচার্য্য, অশোক দে, রুমা দাশগুপ্তা, নেপাল সরকার, উৎপল রায়, কুমার অনুভব, বাবলি ভট্টাচার্য্য, তপন চ্যাটার্জী, মঞ্জিল ব্যানার্জি, রঞ্জন বিশ্বাস, দেবাশীষ মিশ্র, নীলকমল চট্টোপাধ্যায় ও সুবীর চ্যাটার্জি ।

সুবিখ্যাত জনপ্রিয় বলিষ্ঠ যাত্রাভিনেতা প্রদীপ রুজ বাংলা ১৩৯২ থেকে ১৪২৮ সাল অবধি বহু যাত্রাপালায় নিষ্ঠার সঙ্গে অভিনয় করেছেন । মানুষের অগাধ ভালোবাসা পেয়েছেন । অভিনেতা প্রদীপ রুজ অভিনীত যাত্রাপালাগুলির মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হল : বিশ্বত্রাস হিটলার, রাজরক্ত, টিপু সুলতানের তরবারি, দেবী সন্ন্যাসিনী, অভিমান, এক লক্ষ্মীর মন্দির, রাজযোটক, বজ্জাত শ্বশুরের দজ্জাল বৌ, অগ্নিসাক্ষী স্ত্রী, চক বাজারের চামেলী, দশমীতে দেবীর বোধন, মেয়েটি একাই একশো, আমি হরিদাস পালের বৌ, তেরে মেহেরবানিয়া, মা মাটির লড়াই, হিয়ার মাঝে মোর প্রিয়া, শ্মশানে হল শুভদৃষ্টি, আমি বাংলাদেশের বাঘিনী কন্যা, ভাঙ্গা ঘরের রাঙা বৌ, আমি যে নকল সোনার প্রতিমা, ওগো তুমি যে আমার, মিষ্টি মেয়ের দুষ্টু স্বামী, মনের মানুষ পর পুরুষ, চোখ তুলে দ্যাখ না কে এসেছে, আমি শুধু চেয়েছি তোমায় ইত্যাদি । যাত্রাপালার শক্তি সুবিখ্যাত নির্দেশক-অভিনেতা প্রদীপ রুজ আজও যাত্রাধ্যান, যাত্রাজপ । প্রদীপ রুজ আজও প্রবালময় রত্নে সজ্জিত হিমকণাবাহী সুগন্ধি বাতাস ।

krishna Saha

আমার নাম কৃষ্ণ কুমার সাহা, আমি ফুল টাইম সাংবাদিকতা করি।গত ৮ বছর ধরে এই পেশায় আছি