আবহাওয়া দক্ষিণবঙ্গ শিক্ষা লাইফ স্টাইল স্বাস্থ্য ভ্রমন ধর্ম কৃষি কাজ ক্রাইম

সারকোমা সারভাইভার মিট ২০২৬: ক্যানসার জয়ের পর নতুন জীবনের উদযাপন

krishna Saha

Published :

WhatsApp Channel Join Now

ঋদ্ধি ভট্টাচার্য, কলকাতা: ক্যানসারকে হারিয়ে ফিরে আসা প্রতিটি মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প আলাদা। সেই সাহস, লড়াই এবং নতুন করে জীবন শুরু করার ইচ্ছাশক্তিকে সম্মান জানাতে মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস আয়োজন করল ‘সারকোমা সারভাইভার মিট ২০২৬’। এই অনুষ্ঠানে সারকোমা থেকে সুস্থ হওয়া মানুষ, তাঁদের পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক এবং শুভানুধ্যায়ীরা একত্রিত হন।

এই আয়োজন শুধু সাফল্যের গল্প ভাগ করে নেওয়ার জন্য নয়, বরং সারকোমা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, দ্রুত রোগ ধরা পড়ার গুরুত্ব, একাধিক বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং চিকিৎসার পর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেওয়া হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল রোগীদের শুধু সুস্থ করে তোলা নয়, তাঁদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা।

অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন ডা. কৌশিক নন্দী, সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও এইচওডি – অর্থোপেডিক অনকোলজি, মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস। এরপর অরুণিমা দত্ত, কনসালট্যান্ট ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের সময়ে মানসিক শক্তির গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডা. সৌরভ দত্ত, ডিরেক্টর – মণিপাল অনকোলজি সার্ভিসেস ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট – হেড অ্যান্ড নেক অনকোলজি সার্জারি, মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস; এবং ডা. অয়নাভ দেবগুপ্ত, রিজিওনাল ডিরেক্টর, মণিপাল হসপিটালস ইস্ট।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বামী কৃপাকারানন্দজি। তিনি তাঁর বক্তব্যে কঠিন পরিস্থিতিতেও আশা এবং মানসিক শক্তি ধরে রাখার বার্তা দেন। এরপর বিশিষ্ট সংবাদমাধ্যম ব্যক্তিত্ব তরুণ গোস্বামী জীবনের লড়াই এবং কঠিন সময়কে জয় করার শক্তি নিয়ে বক্তব্য রাখেন। পর্বতারোহী অনিন্দ্য মুখার্জি একটি বিশেষ মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনার মাধ্যমে পাহাড় জয়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে জীবনের কঠিন লড়াইয়ের মিল তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানের শেষে সারভাইভারদের পরিবেশিত একটি নাটক সকলকে আবেগাপ্লুত করে। এই পরিবেশনায় সাহস, অধ্যবসায় এবং জীবনের জয়গান তুলে ধরা হয়।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে ৫৫ বছর বয়সী মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং অস্টিওসারকোমা জয়ী চিন্ময় সাহা বলেন, “২০১৫ সালে যখন আমার স্টেজ-২ হাই-গ্রেড অস্টিওসারকোমা ধরা পড়ে, তখন আমার ফিমার হাড়ে ১৪ সেন্টিমিটারের একটি টিউমার ছিল। এরপর শুরু হয় অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, বারবার হাসপাতালে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে ফলো-আপ চিকিৎসা। দশ বছরেরও বেশি সময় পরে আমি বুঝেছি, ক্যানসারকে হারানো শুধু চিকিৎসা শেষ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

See also  সম্মানিত হলেন মঙ্গলকোটের সাংবাদিক মোল্লা জসিমউদ্দিন

নতুন করে জীবনকে গ্রহণ করাও তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অস্টিওসারকোমা আমার জীবনের অনেক কিছু বদলে দিলেও আমার কাজের প্রতি ভালোবাসা বা এগিয়ে চলার ইচ্ছাকে কখনও থামাতে পারেনি। এই রোগ আমার জীবনের একটি অধ্যায়, পুরো গল্প নয়। আজও আমি আমার পছন্দের কাজ করে যাচ্ছি আশা, কৃতজ্ঞতা এবং এই বিশ্বাস নিয়ে যে, সাহস থাকলে যেকোনও কঠিন পরিস্থিতি জয় করা সম্ভব।” নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে ২৯ বছর বয়সী সরকারি কর্মী এবং অস্টিওসারকোমা জয়ী মনিমালা মণ্ডল বলেন, “প্রথমে যখন পায়ে একটি ফোলা জায়গা লক্ষ্য করি, তখন ভেবেছিলাম এটি সাধারণ চোট। খুব বেশি ব্যথাও ছিল না, তাই ক্যানসারের কথা একবারও মনে হয়নি।

পরে একজন অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে জানা যায়, আমার অস্টিওসারকোমা হয়েছে। এখন বুঝতে পারি, শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনকে আমরা অনেক সময় গুরুত্ব দিই না, আর সেই ভুলের মূল্য অনেক বড় হতে পারে। আমার ফিমারের আক্রান্ত অংশ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাদ দিতে হয়েছিল। তবে সময়মতো রোগ ধরা পড়ায় দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়েছে এবং আমি ভালো আছি। আমার সবার কাছে একটাই অনুরোধ, শরীরে দীর্ঘদিন ফোলা, অকারণ ব্যথা বা অন্য কোনও অস্বাভাবিক লক্ষণ থাকলে তা কখনও অবহেলা করবেন না। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে শুধু একটি অঙ্গ নয়, জীবনও বাঁচানো সম্ভব।”


অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ডা. কৌশিক নন্দী বলেন, “সারকোমা একটি বিরল এবং জটিল ধরনের ক্যানসার। এর সফল চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞদের একসঙ্গে কাজ করা খুবই জরুরি। বর্তমানে অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি এবং নতুন ধরনের চিকিৎসার কারণে রোগীদের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়েছে। তবে চিকিৎসা শেষ হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। রোগীদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া, স্বাভাবিক জীবনে ফেরা এবং নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক সহায়তা পাওয়া সমান গুরুত্বপূর্ণ। সারকোমা সারভাইভার মিট প্রতিটি রোগীর সাহস এবং লড়াইকে সম্মান জানায়।

See also  পশ্চিমবঙ্গে লকডাউন ৩১ শে অগস্ট পর্যন্ত

একই সঙ্গে এটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে, সময়মতো রোগ ধরা পড়া, দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা এবং সঠিক চিকিৎসা পেলে ক্যানসারের বিরুদ্ধে জয় সম্ভব।” এই সারকোমা সারভাইভার মিটের মাধ্যমে মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস আবারও জানিয়ে দিল, তাদের লক্ষ্য শুধু ক্যানসারের চিকিৎসা করা নয়, বরং চিকিৎসার পর রোগীদের সুস্থ, স্বাভাবিক এবং আত্মবিশ্বাসী জীবনে ফিরিয়ে আনাও। সারভাইভার, চিকিৎসক এবং পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে এনে এই উদ্যোগ মানুষকে সারকোমা সম্পর্কে সচেতন হতে, সময়মতো চিকিৎসা নিতে এবং আশা হারিয়ে না ফেলতে উৎসাহ দিয়েছে।

সঠিক সময়ে চিকিৎসা, ভালো চিকিৎসা পরিষেবা এবং দৃঢ় মনোবল থাকলে ক্যানসারের পরেও সুন্দর ও অর্থপূর্ণ জীবন যাপন করা সম্ভব।

krishna Saha

আমার নাম কৃষ্ণ কুমার সাহা, আমি ফুল টাইম সাংবাদিকতা করি।গত ১৪ বছর ধরে এই পেশায় আছি