পূর্ব বর্ধমান: শিক্ষকতা শুধু বইয়ের পাতায় শিক্ষা দেওয়া নয়, শিক্ষার্থীদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক পথ দেখানোও একজন আদর্শ শিক্ষকের দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন পূর্ব বর্ধমানের রায়না ১ ব্লকের রসুলপুর সাহেবজান অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পীযূষ দাঁ। রাজ্যের অন্যান্য বিদ্যালয়ের মতো এই বিদ্যালয়েও পড়েছে পুজোর ছুটি। কিন্তু ছুটি থাকলেও পড়ুয়াদের সুস্বাস্থ্য ও পুষ্টির কথা ভেবে এক মুহূর্তের জন্যও নিজের দায়িত্ব থেকে সরে আসেননি প্রধান শিক্ষক। যখন অধিকাংশ পড়ুয়া ছুটির আনন্দে মেতে রয়েছে, তখনও বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত তিনি। বিদ্যালয়ে গিয়ে নিজের হাতে তৈরি করছেন শীতকালীন শাকসবজির বাগান, যাতে আগামী দিনে সেই বাগানের টাটকা সবজি দিয়ে রান্না করা যায় মিড ডে মিলের খাবার।


শুধু পড়াশোনা নয়, শিশুদের পুষ্টির দিকেও বিশেষ নজর বর্তমান সময়ে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে নানা ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। শাকসবজির তুলনায় অনেক সময় মাছ, মাংস, ডিম ও অন্যান্য খাবারের প্রতিই বেশি ঝোঁক দেখা যায়। অথচ শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য সুষম ও পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অপরিসীম। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই রসুলপুর সাহেবজান অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড ডে মিলের জন্য বিদ্যালয় চত্বরে তৈরি করা হয়েছে শাকসবজির বাগান। সেই বাগানের সবজি রান্না করে পড়ুয়াদের পাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। শুধু শাকসবজি নয়, বিদ্যালয়ে চাষ করা হচ্ছে ড্রাগন ফলও। পড়ুয়াদের পুষ্টির কথা মাথায় রেখে সেই ফলও তাদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। অর্থাৎ, শিশুদের শুধু শিক্ষিত করে তোলা নয়, তাদের খাদ্যাভ্যাস ও সুস্বাস্থ্যের দিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে এই বিদ্যালয়।
পুজোর ছুটিতেও ভবিষ্যতের প্রস্তুতি ছুটি মানেই অনেকের কাছে বিশ্রামের সময়। কিন্তু প্রধান শিক্ষক পীযূষ দাঁর কাছে এই সময়টাও পড়ুয়াদের জন্য নতুন কিছু করার সুযোগ। তাই পুজোর ছুটির মধ্যেও নিয়মিত বিদ্যালয়ে গিয়ে শীতকালীন সবজি বাগান তৈরির কাজে ব্যস্ত তিনি।এই বাগানে ফলবে টাটকা শাকসবজি। আর সেই সবজি দিয়ে তৈরি হবে মিড ডে মিলের খাবার, যা পৌঁছে যাবে ছোট ছোট পড়ুয়াদের পাতে। ভাবুন তো, একজন শিক্ষক নিজের ছুটির সময়টুকুও ব্যয় করছেন তাঁর পড়ুয়াদের জন্য! তাঁর এই উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা এবং আগামী প্রজন্মকে সুস্থভাবে গড়ে তোলার আন্তরিক প্রচেষ্টা। এমন শিক্ষকই সমাজের প্রকৃত সম্পদ একজন আদর্শ শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না। তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখান প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব, পরিশ্রমের মর্যাদা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা।
বিদ্যালয়ের এই সবজি বাগান আগামী দিনে শিশুদের কাছে বাস্তব শিক্ষারও একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। গাছ লাগানো, পরিচর্যা করা, সবজি উৎপাদন এবং সেই খাবারের উপকারিতা সম্পর্কে হাতে-কলমে জানার সুযোগ পাবে তারা। প্রধান শিক্ষক পীযূষ দাঁর এই উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়, একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য শুধু পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর সাফল্য লুকিয়ে থাকে ছাত্রছাত্রীদের সুস্থতা, তাদের ভালো থাকা এবং তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার মধ্যে। আজ যখন নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত থাকার প্রবণতা বাড়ছে, তখন নিজের অবসর ও ছুটির সময়টুকু পড়ুয়াদের কল্যাণে ব্যয় করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন তিনি। কৃষকসেতু নিউজ বাংলার পক্ষ থেকে রসুলপুর সাহেবজান অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পীযূষ দাঁকে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা, অজস্র শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আপনার এই ভালো কাজ আরও অনেক শিক্ষককে অনুপ্রাণিত করুক। আপনার হাত ধরেই আগামী প্রজন্ম হয়ে উঠুক সুস্থ, সচেতন ও মানবিক। ভালো থাকুন মাস্টারমশাই। আপনার মতো শিক্ষকরাই শুধু শিক্ষার জগৎ নয়, বদলে দিতে পারেন গোটা সমাজকে।









