উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকদ্বীপ : মুড়িগঙ্গা নদীর উপর প্রস্তাবিত সেতুর উদ্বোধন ২০২৯ সালে করা হবে।শনিবার কাকদ্বীপে এক সরকারি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে এমনই ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পাশাপাশি আগামী দু’বছরের মধ্যে কাকদ্বীপকে পৃথক জেলা হিসেবে গড়ে তোলার আশ্বাসও দেন তিনি। সুন্দরবনের সামগ্রিক উন্নয়ন, পর্যটনের প্রসার এবং আবাসন প্রকল্প নিয়েও একাধিক প্রতিশ্রুতি দেন মুখ্যমন্ত্রী।দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত মুড়িগঙ্গা সেতু নির্মাণ নিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখালেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, আগের সরকার সেতু নির্মাণের ঘোষণা করলেও জমি অধিগ্রহণ ও বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করেনি। পূর্ববর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, সেতু নির্মাণ নিয়ে শুধু প্রতিশ্রুতিই দেওয়া হয়েছিল।

তবে তাঁর সরকার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত করতে উদ্যোগী হবে। ২০২৯ সালে সেতুর উদ্বোধন করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি। সাগরদ্বীপকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে মুড়িগঙ্গা নদী। বর্তমানে নদী পারাপারের অন্যতম মাধ্যম ভেসেল পরিষেবা। কিন্তু ভাটার সময় নদীতে জলস্তর কমে গেলে ভেসেল চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের। বিশেষ করে রোগী, প্রবীণ নাগরিক, মহিলা ও শিশুদের দুর্ভোগ বাড়ে। এই পরিস্থিতিতে মুড়িগঙ্গার উপর সেতু নির্মিত হলে সাগরদ্বীপের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। যাতায়াতের পাশাপাশি পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জরুরি পরিষেবার ক্ষেত্রেও এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
এর আগে মুড়িগঙ্গা নদীর উপর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের গঙ্গাসাগর সেতু নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল তৎকালীন রাজ্য সরকার। প্রস্তাবিত সেতুর মাধ্যমে কাকদ্বীপের সঙ্গে কচুবেড়িয়াকে যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল। সেতুর দু’দিকে ফুটপাথ তৈরির প্রস্তাবও সামনে এসেছিল।
তৎকালীন সরকারের তরফে প্রকল্পের নকশা, সমীক্ষা ও বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন নিয়ে কাজ এগোনোর কথা জানানো হয়েছিল। তবে সেই প্রকল্পের অগ্রগতি ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এদিন প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী।দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে কাকদ্বীপকে পৃথক জেলা হিসেবে গড়ে তোলার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, প্রয়োজনে দু’বছর সময় লাগলেও এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পৃথক জেলা গঠিত হলে প্রশাসনিক পরিষেবা মানুষের আরও কাছে পৌঁছবে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সুন্দরবনকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে গড়ে তোলার কথাও বলেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন অবহেলিত থেকেছে। এই অঞ্চলের পরিকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যটন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে তাঁর সরকার বিশেষ গুরুত্ব দেবে।দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার উন্নয়ন প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগামী কয়েক মাসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক কাজের গতি বাড়ানো হবে। পর্যটন শিল্পের প্রসারেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনার কথাও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।পাশাপাশি গঙ্গাসাগর মেলা এবং সুন্দরবনের নদীবাঁধ সংক্রান্ত বিষয়েও প্রশাসনিক স্তরে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। নদীবাঁধের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ সুন্দরবনের মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাও এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান দাবি।জেলায় আরও ৪ লক্ষ ৮১ হাজার বাড়ি তৈরির ঘোষণা
আবাসন প্রকল্প নিয়েও বড় ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় নতুন করে ৪ লক্ষ ৮১ হাজার ২৪২টি বাড়ি তৈরি করা হবে। তাঁর দাবি, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জেলায় কাঁচাবাড়ির সমস্যা অনেকটাই কমবে।আগের সরকারের আমলে আবাসন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগও তোলেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, বাড়ি তৈরির প্রকল্পে যাতে কোনও ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম না হয়, তা নিশ্চিত করা হবে। প্রকৃত উপভোক্তারা যাতে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পান, সে বিষয়ে নজরদারির আশ্বাসও দেন তিনি।এদিন নাবালিকা বিবাহ রোধে সকলকে সতর্ক থাকার বার্তাও দেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি জেহাদি কার্যকলাপ, জঙ্গি তৎপরতা এবং দেশের নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক কোনও কার্যকলাপ যাতে মাথাচাড়া দিতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনকে সজাগ থাকার নির্দেশ দেন তিনি।
গঙ্গাসাগর মেলাকে ঘিরেও বিশেষ প্রস্তুতির কথা উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। এ বছরের মেলাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার আশ্বাস দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগামী ১০ জানুয়ারি গঙ্গাসাগর মেলার উদ্বোধন করতে তিনি ফের আসবেন।সব মিলিয়ে মুড়িগঙ্গা সেতুর নির্মাণ, কাকদ্বীপকে পৃথক জেলা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা, আবাসন প্রকল্প এবং সুন্দরবনের পর্যটন ও পরিকাঠামোগত উন্নয়ন—একাধিক ঘোষণা ঘিরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে ঘোষিত প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং কাজের অগ্রগতির উপরই নির্ভর করবে এই প্রতিশ্রুতিগুলির বাস্তব ফলাফল।







