দু’বছর আগের ঘটনা হলেও জনমানসে এখনো টাটকা হয়ে আছে সন্দেশখালির সন্ত্রাস কাহিনী। চাষ জমি কেড়ে নেওয়া,তোলাবাজি ও অত্যাচার চালানোর অভিযোগে সন্দেশখালির তৃণমূল নেতা শেখ শাহজাহানের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে ছিলেন সন্দেশখালির বাসিন্দারা।সেই থেকে এখনো জেলে দিন কাটাচ্ছে শাহজাহান। তারই মধ্যে বাংলার রাজনীতিতে ঘটে গিয়েছে পালা বদল। বিজেপি বাংলার মসনদ দখল করতেই আর এক ভয়ংকর অত্যাচারী তৃণমূল নেতার যাবতীয় সন্ত্রাস কাহিনী ও লুটের সাম্রাজ্যের পর্দা ফাঁস করলেন পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর বিধানসভার বাসিন্দারা।শাহজাহানের সমতুল্য ওই তৃণমূলন নেতার নাম তাবারক আলি মণ্ডল। পুলিশের হাতে বন্দি হয়ে তিনি এখন শ্রীঘরে দিন কাটাচ্ছেন।

জামালপুরের জ্যোৎশ্রীরাম অঞ্চলের এক অখ্যাত গ্রাম শাহহোসেনপুর।তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের জামালপুর ব্লকের সভাপতি তাবারক আলি মণ্ডল এই গ্রামেরই বাসিন্দা। তাঁর স্ত্রী আরিফা মণ্ডল তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত জ্যোৎশ্রীরাম গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান। তাবারক জামালপুর ব্লক তৃণমূলের সভাপতি মেহেমুদ খাঁনের অত্যন্ত ঘনিষ্ট নেতা হিসাবেই এলাকায় পরিচিত । গ্রামবাসীদের অভিযোগ,“২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে মেহেমুদ খাঁন তৃণমূলের জামালপুর ব্লকের সভপতি পদ পান।তারপর থেকেই মেহেমুদ খাঁনের মদতে ও প্রশ্রয়ে তাবারক আলি মণ্ডল নিজেকে জ্যোৎশ্রীরাম অঞ্চলের ’বেতাজ বাদশা’ প্রতিপন্ন করা শুরু করে দেন।তারই সাথে তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে এলাকায় সন্ত্রাস কায়েম করা ও অত্যাচার চালানো শুরু করেন। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে জিতে তৃণমূল কংগ্রেস দল রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর তাবারক আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সময় গড়ানোর সাথে সাথে তাবারক এলাকার বাসিন্দাদের উপর সীমাহীন সন্ত্রাস,অত্যাচার ও জুলুমবাজি চালিয়ে তাঁর লুটের সাম্রাজ্যের শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়ে চলেন।এই সব করে মাত্র ৫ বছরের মধ্যে সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে তাবারক বিপুল ধন ও সম্পত্তির অধিকারী বনে গিয়েছেন বলে গ্রামবাসীরা জানান।
এহেন তৃণমূল নেতা তাবারক আলি মণ্ডল এখনশ্রীঘর বাসি। ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায়বিজেপির জয়জয়কার ঘটতেই তাবারক তাঁর ঘর বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র গা ঢাকা দেন। তবে গা ঢাকা দিয়েও তিনি রেহাই পান নি। এক বিজেপি নেতার দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ গত ১৩ মে তাবারককে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠায়। সেই খবর পেয়েই তাবারক ও তার দলবলের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন ফতেপুর,শাহহোসেনপুর , কৃষ্ণরামপুর সহ গোটা জ্যোৎশ্রীরাম অঞ্চলের বাসিন্দারা।তারা আমাদের প্রতিনিধিকে এলাকায় ডেকে নিয়ে গিয়ে তাবারকের সমস্ত অপকর্মের ডেরা গুলি দেখিয়ে তার যাবতীয় সন্ত্রাস,অত্যাচার ও লুটের পর্দা ফাঁস করেন।
শাহহোসেনপুর গ্রামের বিজেপি কর্মী শেখ তাজের আলি এবং শেখ মোরতাজ তাঁদের গ্রামের একটি সরকারি ফ্লাড সেন্টার দেখিয়ে দাবি করেন,এই ফ্লাড সেন্টারটিকে তাবারক তাঁর অপকর্মের ডেরায় পরিণত করেছিল। ফ্লাড সেন্টারের একাধীক ঘর ঘুরে দেখার পরেই প্রমাণ হয়ে যার গ্রাববাসি ও বিজেপি কর্মীরা কোন মিথ্যা কথা বলছেন না।ফ্লাড সেন্টারের দুটি ঘর ঘুরে দেখাযায় সেখানে মজুত রয়েছে রায়ায়নিক সার,চালের বস্তা,কীটনাশক সহ বহু গ্রামবাসীর ১০০ দিনের কাজের জব কার্ড , আধার কার্ড এবং জমির দলিলের জেরক্স কপি। এসব ছাড়াও ওই ঘরগুলিতে তৃণমূল কংগ্রেস দলের বেশ কিছু পতাকা ,লাঠি ও ডান্ডা এবং দামি মদের অজশ্র খালি বোতল পড়ে থাকতে দেখা যায়।এইসব কিছু দেখিয়ে তাজের আলি এবং শেখ মোরতেজ জানান,সার ,কীটনাশক এবং চালের বস্তাগুলি জ্যোৎশ্রীরাম পঞ্চায়েত থেকে এলাকার গরির মানুষ এবং চাষিদের বিলিবন্টন করার কথা থাকলেও তা করা হয় নি।উল্টে ব্ল্যাকে বিক্রি করার জন্য এইসব কিছু ফ্লাড সেন্টারে এনে মজুত করে রাখা হয়েছিল।১০০ দিনের কাজের টাকা আত্মসাৎ করতে বহু লোকের জব কার্ড হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
গ্রামের লোকজন ও বিজেপি কর্মীরা ফ্লাড সেন্টারের জায়গা সহ তার আসে পাশে মজুত থাকা বালির স্ট্যাগ আমাদের প্রতিনিধি কে ঘুরিয়ে দেখান। গ্রাম বাসিরা দাবি করেন,বালি লুটের সঙ্গে যুক্ত তাবারকের দলবল ফ্লাড সেন্টারটিকে তাদের ডেরা ও নিশি যাপনের স্থান হিসাবে ব্যবহার করতো। তার জন্য ফ্লাড সেন্টারের একটি বড় ঘরে খাট বিছানা সহ সমস্ত ব্যবস্থা রাখা ছিল ।সেইসব এখনো ওই ঘরে রয়ে আছে।ওই ঘর থেকে বালি লুটের হিসাব খাতাও পায়া গিয়েছে। তাজের আলি ও শেখ মোরতেজ জানান,বর্ষার মরশুমে চড়া দরে বিক্রি করার জন্য তাবারক ও তার বাহিনীর লোকজন ওই বিপুল পরিমাণ বালি দামোদর থেকে লুট করে গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় মজুত করেছে।ওই বালি বাজেয়াপ্ত করার দাবিও তারা করেছেন। দামোদরের যে যে জায়গায় অবৈধ খাদান খোলা হয়েছিল সেগুলিও গ্রামবাসীরা ইণ্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলাকে ঘুরিয়ে দেখান।ফ্লাড সেন্টারের লাগোয়া জায়গায় কয়েকবছর আগে প্রাইমারি স্কুল গড়ে তোলা হলেও সেই স্কুলটি শিক্ষকের অভাবে আজও চালু হয়নি।বছরের পর বছর ধরে স্কুলটি তালাবন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে বলে গ্রামবাসীরা জানান।গ্রামবাসী শেখ আব্দুল আলি সহ অনেকেই তৃণমূল নেতা তাবারক আলিকে সন্দেশখালির শেখ শাহজাহানের তুলনা করে তার বিরুদ্ধেও ইডি (ED) ও সিবিআই (CBI)কে দিয়ে তদন্ত শুরুর দাবি করেছেন।

এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ,তাবারক ও তাঁর দলবলের লুটের সাম্রাজ্য শুধুমাত্র শাহহোসেনপুরে সীমাবদ্ধ থাকে নি। তাবারক স্থানীয় কৃষ্ণরামপুর ও তার লাগোয়া মাধবডিহি থানার ফতেপুরেও তাঁর বালি লুটের সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছিলেন বলে গ্রামবাসী নিমাই মাঝি,চাঁদ আদক এবং সুরজিৎ সাঁতরা দাবি করেছেন। এঁনারা বলেন,পূর্বতন সরকার ও ব্লক প্রশাসন পরিকল্পনাহীণ ভাবে একটি কমিউনিটি হল তৈরি করে কৃষ্ণরামপুর গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে দামোদর লাগোয়া জনশূন্য জায়গায়। কমিউনিটি হলের সামনে দাঁড় করানো থাকা দুটি জেসিবি মেশিন দেখিয়ে চাঁদ আদক ও সুরজিত সাঁতরা বলেন,কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে এই কমিউনিটি হলটি তৈরি হলেও তার কোন সুবিধা এলাকার সাধারণ মানুষ কোন দিনও পান নি।উল্টে এই কমিউনিটি হলটি তাবারক ও তাঁর বালি লুটেরা বাহিনীর ফুর্তির একটি ডেরায় পরিণত হয়েছিল।তাবারকের লেঠেল বাহিনীরও অবাধ যাতায়াত ছিল এই কমিউনিটি হলে।
নিমাই মাঝি বলেন,বালি লুটের জন্য ফতেপুরের বহু লোকের চাষ জমির দখল জোরপূর্ব নিয়ে নিয়েছিল তাবারক। অবৈজ্ঞানিক ভাবে সেই জমি থেকে প্রথমে মাটি এবং পরে দু’মানুষ সমান গর্ত করে বালি লুট করেছে তাবারক ও তাঁর বাহিনী। বালি লুটের পথ সুগম করতে তাবারক ফতেপুরে থাকা হিন্দুদের শ্মশান পর্যন্ত দখল করে নিয়েছে । এমনকি শ্মশানের লাগোয়া জায়গায় থাকা গঙ্গা দেবীর পুজোর বেদির উপর দিয়ে তাবারক বালি বোঝাই ট্রাক,লরি ও ডাম্পার যাওয়ার রাস্তাও বানায়।এইসব অন্যায় কাজের কথা পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তাদের জানানো হলেও তা নিয়ে আইনি কোন ব্যবস্থা কোনদিন নেওয়া হয়নি বলে নিমাই মাঝি ও সুরজিৎ সাঁতরারা অভিযোগ করেন ।তাঁরা এও বলেন,তৃণমূল রাজত্বে তাবারকের কোনও অন্যায় কাজের প্রতিবাদ কেউ করলেই তার পরিণাম হত ভয়ংকর। ওই প্রতিবাদীকে তাবারক তাঁর বাড়ি লাগোয়া “বকুলতলার“ একটি ডেরায় হাজির করাতো। এরপর হাত পা বেঁধে বেধড়ক পিটিয়ে তাবারক ওই প্রতিবাদিদের মুখে কুলুপ আঁটানো করাতো বলে অভিযোগ করেছেন গ্রামবাসীরা।
এইসব ঘটনা নিয়ে বিডিও (জামালপুর)পার্থসারথি দের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রথমে পাশ কাটান। পরে তিনি বলেন,“হ্যাঁ ফ্লাড সেন্টার এবং কমিউনিটি হলটি ব্লক প্রশাসনের অধীনে থাকা সরকারী সম্পত্তি। তবে সরকারি এই বিল্ডিং গুলির চাবি ওখানকার পঞ্চায়েতকে দেওয়া ছিল । ওই বিল্ডিং গুলিতে যে এইসব কাজ হত সেই ব্যাপারে আমি ওয়াকিবহাল ছিল না।“ তাবারকের বিরুদ্ধে ওঠা এইসব অভিযোগের বিষয় নিয়ে জামালপুর ব্লক তৃণমূলের সভাপতি মেহেমুদ খাঁনকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেন নি। তবে সব শুনে জামালপুরের বিজেপি বিধায়ক অরুণ হালদার বলেন , যা শুনলাম তা অত্যন্ত ভয়ংকর ঘটনা। এর উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত যাতে হয় তার জন্য রাজ্য প্রশাসনের কাছে আবেদন রাখবেন বলে অরুণ হালদার জানিয়েছেন।”










