কৃষ্ণ সাহা , রায়না: ঢাকের বাদ্যি ছাড়া বাঙালির দুর্গোৎসব যেন অসম্পূর্ণ। মণ্ডপে মণ্ডপে যখন দেবী দুর্গার আরাধনায় মেতে ওঠেন মানুষ, তখন উৎসবের আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন ঢাকিরা। তাঁদের হাতের কাঠির ছন্দে জেগে ওঠে পুজোর আনন্দ, প্রতিটি বোলে মিশে থাকে বাংলার লোকসংস্কৃতি ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা ঐতিহ্য। সেই প্রাচীন ঐতিহ্যকেই আজও সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছেন পূর্ব বর্ধমান জেলার রায়না-১ ব্লকের বেঁন্দুয়া গ্রামের ঢাকিরা।


বছরের অন্যান্য সময়ে জীবিকার তাগিদে কেউ চাষবাস করেন, কেউ মাছ ধরেন, কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। আবার কেউ টোটো চালানো, জরি কিংবা কাঠের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। কিন্তু দুর্গাপুজো এলেই বদলে যায় তাঁদের জীবনের ছন্দ। বাপ-ঠাকুরদার হাত ধরে শেখা ঢাক বাজানোর শিল্পকে নতুন করে আপন করে নেন তাঁরা। ধুলো ঝেড়ে বেরিয়ে আসে ঢাক, হাতে উঠে আসে কাঠি। শুরু হয় তালিম ও পুজোর প্রস্তুতি।
এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বেঁন্দুয়া গ্রামের প্রায় ৫০ জন ঢাকি দুর্গোৎসবে ঢাক বাজানোর জন্য পাড়ি দিয়েছেন বিভিন্ন প্রান্তে। কেউ গিয়েছেন বেঙ্গালুরু, কেউ কর্ণাটকের অন্যান্য এলাকায়, আবার কেউ পাড়ি দিয়েছেন কলকাতার বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে। নিজের গ্রাম ছেড়ে, প্রিয়জনদের থেকে দূরে গিয়ে তাঁরা অন্য শহরের মানুষের উৎসবের আনন্দকে আরও রঙিন করে তুলতে প্রস্তুত।
পরিবার ছেড়ে দূরে থাকা কষ্টের, তবু ঐতিহ্যের টান অমোঘ
দুর্গাপুজোর চার-পাঁচটি দিন ঢাকিদের কাছে যেমন আনন্দের, তেমনই আবেগের। উৎসবের সময় অন্যের মণ্ডপে ঢাক বাজিয়ে সকলকে আনন্দ দিলেও নিজের বাড়ি, পরিবার ও প্রিয়জনদের ছেড়ে থাকা সহজ নয়। তবু পেশার দায়িত্ব এবং বংশপরম্পরায় পাওয়া শিল্পের প্রতি ভালোবাসা তাঁদের বারবার টেনে নিয়ে যায় দূরদূরান্তে।
এক ঢাকির কথায়, পুজোর এই ক’টা দিন পরিবারকে ছেড়ে থাকতে মন খারাপ হয় ঠিকই। কিন্তু পুজো শেষ করে বাড়ি ফিরে পরিবারের সকলের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেও রয়েছে আলাদা তৃপ্তি। অন্যের উৎসবকে আনন্দময় করে তোলার পর নিজের ঘরে ফিরে প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোই তাঁদের কাছে বড় প্রাপ্তি।
বেঁন্দুয়ার ঢাকিদের শিল্পসত্তায় বেঁচে রয়েছে বাংলার লোকসংস্কৃতি
বেঁন্দুয়া গ্রামের বাসিন্দা উত্তম মালিক জানান, ঢাক বাজানো শুধুমাত্র জীবিকা নির্বাহের একটি মাধ্যম নয়, এটি একটি শিল্প। এই শিল্পের মধ্যেই জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, গ্রামের পরিচয় এবং বাংলার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
তাঁর কথায়, “এটা একটা শিল্প। নিজেদের শিল্পসত্তাকে বজায় রাখতে তাঁরা আজও পুজোর সময় বাইরে ঢাক বাজাতে যেতে চান। এটা আমাদের গ্রামের ঐতিহ্য। আজ তাঁরা বিভিন্ন বড় বড় মণ্ডপে ঢাক বাজিয়ে মানুষকে আনন্দ দিচ্ছেন। আমি তাঁদের সাধুবাদ জানাই।”

ঐতিহ্য আছে, কিন্তু রয়েছে জীবিকার লড়াইও
বেঁন্দুয়ার ঢাকিদের জীবনযাত্রার দিকে তাকালে উঠে আসে এক বাস্তব ছবিও। দুর্গাপুজোর কয়েকটি দিন তাঁদের কাছে বিশেষ উপার্জনের সুযোগ হলেও বছরের বাকি সময়ে শুধু ঢাক বাজিয়ে সংসার চালানো কঠিন। তাই ঐতিহ্যকে ভালোবেসে আঁকড়ে রাখলেও জীবিকার প্রয়োজনে তাঁদের বেছে নিতে হয় নানা বিকল্প পেশা।
অন্যদিকে, আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম ও রেকর্ড করা গানের বাড়বাড়ন্তের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ঢাকের শিল্পকে ধরে রাখাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন প্রজন্মের কাছে এই শিল্পকে আকর্ষণীয় করে তোলা এবং শিল্পীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ ঢাক কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র নয়, বাঙালির উৎসবের আবেগ ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীক।

বেঁন্দুয়া গ্রামের এই ঢাকিরা তাই শুধু দুর্গাপুজোয় ঢাক বাজাতে বাইরে যাচ্ছেন না, তাঁরা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন বাংলার মাটির গন্ধ, পূর্বপুরুষদের শিক্ষা এবং রাঢ় বাংলার লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত উত্তরাধিকার।
দেবীর আগমনী থেকে বিসর্জনের বিষাদ—প্রতিটি মুহূর্তে তাঁদের ঢাকের বোল মানুষের মনে জাগিয়ে তোলে উৎসবের অনুভূতি। আর সেই ছন্দের মধ্য দিয়েই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকুক বেঁন্দুয়া গ্রামের ঐতিহ্য, বাংলার লোকশিল্প এবং ঢাকিদের আত্মপরিচয়।









