আবহাওয়া দক্ষিণবঙ্গ শিক্ষা লাইফ স্টাইল স্বাস্থ্য ভ্রমন ধর্ম কৃষি কাজ ক্রাইম

বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবসে সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষায় ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণের গুরুত্ব বৃদ্ধির দাবি

krishna Saha

Published :

WhatsApp Channel Join Now

উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়,সুন্দরবন : প্রতি বছর ২৬ জুলাই বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস। ২০১৫ সালে ইউনেস্কো এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো ম্যানগ্রোভ বনভূমির পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এই অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে বিশ্বব্যাপী উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করা।ম্যানগ্রোভ এমন এক বিশেষ ধরনের বন, যা সমুদ্র উপকূল, নদীমোহনা এবং লবণাক্ত জলাভূমিতে জন্মায়।

জোয়ার ভাটার সঙ্গে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে এই গাছগুলির।তাদের শ্বাসমূল ও বিস্তৃত শিকড়ের জাল মাটি আঁকড়ে ধরে উপকূলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে।একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সুনামির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাত অনেকটাই কমিয়ে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করে।ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গর্ব সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য।

রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত এই বনভূমি অসংখ্য প্রাণী, পাখি, মাছ ও জলজ জীবের নিরাপদ আশ্রয়।সুন্দরবনের জীব বৈচিত্র্য শুধু ভারতের নয়, সমগ্র বিশ্বের কাছে এক অমূল্য সম্পদ।পাশাপাশি এই অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ম্যানগ্রোভের ওপর নির্ভরশীল।আর রবিবার বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস উপলক্ষে সুন্দরবনের চারটি ব্লকে সচেতনতামূলক কর্মসূচি হয়ে গেল।এদিন মথুরাপুর দু নং ব্লকের নন্দকুমারপুর সবুজ সংঘের বি এড কলেজে,পাথরপ্রতিমার হেরম্ব গোপালপুরে, সাগর ও নামখানায় বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস উপলক্ষে সুন্দরবনের উপকূলীয় অঞ্চল জুড়ে সবুজ সংঘের উদ্যোগে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করা হয়।

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবমোকাবিলা এবং ম্যানগ্রোভ বন রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।এদিনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাগরের বিধায়ক সুমন্ত মণ্ডল,নন্দকুমারপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান মুজিবর রহমান খান, হেরম্বগোপালপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান, দিগম্বরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের উপ-প্রধান, বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষিকা, সমাজসেবী, জনপ্রতিনিধি, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য, ছাত্র-ছাত্রী এবং এলাকার বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ।এদিন ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণের বার্তা নিয়ে বর্ণাঢ্য সচেতনতামূলক র‍্যালি, ছাত্র ছাত্রীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,পরিবেশ ও ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ বিষয়ক আলোচনা সভা হয়ে গেল অতিথিদের মূল্যবান বক্তব্য এবং স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে পরিবেশ রক্ষার শপথ গ্রহণের মধ্যে দিয়ে।

See also  আড়াইশো বছর ধরে পূর্ব বর্ধমানের বড়শুলের ‘দে’ বাড়িতে পুজিত হচ্ছেন হরগৌরী।

এদিন বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, উপকূলীয় অঞ্চলকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি থেকে সুরক্ষা প্রদান এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ম্যানগ্রোভ বন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই ম্যানগ্রোভ ধ্বংস রোধ এবং নতুন করে ম্যানগ্রোভ রোপণের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সবুজ পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।এদিন সবুজ সংঘের পক্ষ থেকে জানানো হয়,তারা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন অঞ্চলে পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন, জীবিকা উন্নয়ন এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে। বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবসের এই উদ্যোগ পরিবেশ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ম্যানগ্রোভ রক্ষায় সামাজিক আন্দোলনকে বেগবান করবে।

বিজ্ঞানীদের মতে, ম্যানগ্রোভ বন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। এই বন বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ করে দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণ করতে সক্ষম, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই একে ‘ব্লু কার্বন ইকোসিস্টেম’-এর অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।কিন্তু উদ্বেগের বিষয়, নগরায়ন, অবৈধ দখল, চিংড়ি চাষের জন্য বনভূমি ধ্বংস, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ম্যানগ্রোভ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ও এই বনভূমির অস্তিত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যানগ্রোভ রক্ষা করতে হলে বন উজাড় বন্ধ করা, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ, নদী ও জলাভূমি দূষণমুক্ত রাখা এবং স্থানীয় মানুষকে সংরক্ষণ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি পরিবেশ শিক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে ম্যানগ্রোভের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে।বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের বার্তা বহন করে। সুন্দরবনসহ বিশ্বের সব ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে রক্ষা করতে হলে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণও সমানভাবে প্রয়োজন।কারণ ম্যানগ্রোভ বাঁচলে উপকূল বাঁচবে, জীববৈচিত্র্য বাঁচবে, আর সুরক্ষিত থাকবে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।

krishna Saha

আমার নাম কৃষ্ণ কুমার সাহা, আমি ফুল টাইম সাংবাদিকতা করি।গত ১৪ বছর ধরে এই পেশায় আছি