প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় | পূর্ব বর্ধমান | ২৪ জুলাইভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে, তাঁদের অন্যতম বিপ্লবী রাসবিহারী বসু। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক, আজাদ হিন্দ বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পূর্বসূরি হিসেবে তাঁর অবদান আজও দেশের ইতিহাসে অনন্য।

অথচ সেই মহান বিপ্লবীর জন্মভিটাই আজ অবহেলা ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।পূর্ব বর্ধমান জেলার রায়না–২ ব্লকের বড়বৈনান অঞ্চলের সুবলদহ গ্রামে অবস্থিত রাসবিহারী বসুর পৈতৃক জন্মভিটায় পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সরব হন পূর্বস্থলী উত্তর কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক গোপাল চট্টোপাধ্যায়। তিনি বিষয়টি উত্থাপন করে বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামীর স্মৃতিবিজড়িত জায়গায় এ ধরনের নির্মাণ দেশের ইতিহাস ও বীর শহিদদের প্রতি চরম অসম্মান।বিধায়ক দাবি করেন, আগামী ১৫ আগস্ট, দেশের স্বাধীনতা দিবসের আগেই ওই পাবলিক টয়লেট বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হোক এবং রাসবিহারী বসুর জন্মভিটাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় সংরক্ষণ করা হোক।
পাশাপাশি তিনি রাজ্য সরকারের কাছে বিপ্লবীর জন্মস্থানকে ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ হিসেবে গড়ে তোলার আবেদন জানান।এদিন বিধানসভায় বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ বলেন, “যদি সত্যিই বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর জন্মভিটায় পাবলিক টয়লেট নির্মাণ হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসকের কাছেও বিস্তারিত রিপোর্ট চাওয়া হবে।”ভূমি রেকর্ডে নেই রাসবিহারী বসুর নাম!স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাসবিহারী বসুর পৈতৃক সম্পত্তির সরকারি নথিতেও বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে।

গ্রামের বাসিন্দা মনসুর রহমান সাহানা জানান, আরএস (RS) এবং সিএস (CS) রেকর্ডে সুবলদহ মৌজার ৩১৫৭ নম্বর দাগে রাসবিহারী বসু, বিজনবিহারী বসু এবং বিপিনবিহারী বসুর নাম নথিভুক্ত ছিল। কিন্তু পরে এলআর (LR) রেকর্ডে তাঁদের নাম বাদ দিয়ে অন্য দু’জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।গ্রামবাসীদের দাবি, প্রায় দুই বছর আগে ভূমি রেকর্ড সংশোধনের জন্য ব্লক ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরে আবেদন করা হলেও এখনও পর্যন্ত কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ফলে বিপ্লবীর জন্মভিটা সরকারি স্বীকৃতি ও সংরক্ষণ থেকে বঞ্চিত রয়েছে।গ্রামবাসীদের ক্ষোভসুবলদহ গ্রামের বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, দেশের স্বাধীনতার জন্য যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর জন্মভিটায় আজ অবহেলার চিহ্ন স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনও স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর বা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্টে সেখানে পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে রাজ্য পর্যটন দপ্তরের প্রায় ৩ লক্ষ ৪৪ হাজার ৩৮ টাকা ব্যয়ে ওই পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হয়।

এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ শুরু হলেও কার্যকর কোনও পদক্ষেপ হয়নি বলে তাঁদের দাবি।কে ছিলেন রাসবিহারী বসু১৮৮৬ সালের ২৫ মে পূর্ব বর্ধমান জেলার সুবলদহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রাসবিহারী বসু। তাঁর বাবা বিনোদবিহারী বসু কর্মসূত্রে হুগলির চন্দননগরে থাকতেন। সেখানেই রাসবিহারীর শিক্ষাজীবন কাটে। ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।১৯০৮ সালের আলিপুর বোমা মামলার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে যায়। পরে তিনি দেরাদুনে বন গবেষণা ইনস্টিটিউটে চাকরি করলেও গোপনে বিপ্লবী সংগঠনের কাজ চালিয়ে যান।
১৯১২ সালে দিল্লিতে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের উপর বোমা হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে ব্রিটিশ পুলিশের নজরে আসেন।১৯১৫ সালে ছদ্মনামে ভারত ত্যাগ করে জাপানে চলে যান। সেখানে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের আন্তর্জাতিক ভিত্তি গড়ে তোলেন এবং পরে আজাদ হিন্দ বাহিনী (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি) গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর উদ্যোগেই জাপান ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন জানায়।
পরবর্তীতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর হাতে আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হয়।১৯৪৫ সালের ২১ জানুয়ারি জাপানে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে জাপান সরকার তাঁকে “Second Order of the Merit of the Rising Sun” সম্মানে ভূষিত করে।স্বাধীনতার ৮০ বছরেও অবহেলায় জন্মভিটাআগামী ২০২৬ সালে দেশজুড়ে পালিত হবে স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষ।

সেই সময় দেশজুড়ে রাসবিহারী বসুর অবদান স্মরণ করা হলেও, তাঁর নিজের জন্মভিটা আজও সংরক্ষণের অভাবে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ভূমি রেকর্ড সংশোধন করে বিপ্লবীর জন্মভিটাকে ঐতিহাসিক স্মৃতিক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলুক প্রশাসন এবং সেখানে নির্মিত পাবলিক টয়লেট অপসারণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামীর মর্যাদা রক্ষা করা হোক।









