কৃষ্ণ সাহা , রায়না:- উড়িষ্যার ভুবনেশ্বরে অনুষ্ঠিত সারা ভারতের দ্বিতীয় জেকে এ ক্যারাটে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ-২০২৬-এ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে পূর্ব বর্ধমানের প্রতিযোগীরা। তবে অসংখ্য সাফল্যের ভিড়ে এক বিশেষ গল্প ছুঁয়ে গেল সকলের মন—রায়না থানার বুজরুকদিঘি গ্রামের ছেলে সৌমজিৎ বোসের জয়যাত্রা, যার নেপথ্যে রয়েছে এক মায়ের অক্লান্ত সংগ্রাম, ত্যাগ ও অদম্য বিশ্বাস।

ভুবনেশ্বরের কিট ইউনিভার্সিটির ইনডোর স্টেডিয়ামে আয়োজিত এই জাতীয় প্রতিযোগিতায় দেশের ১৩টি রাজ্যের প্রায় ৬০০ জন প্রতিযোগী অংশ নেন। সেই কঠিন প্রতিযোগিতার মঞ্চে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়ে একটি স্বর্ণপদক ও একটি ব্রোঞ্জ পদক জিতে পূর্ব বর্ধমান তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ উজ্জ্বল করেছে সৌমজিৎ।
কিন্তু এই সাফল্যের গল্প শুধু একটি পদক জয়ের গল্প নয়; এটি এক মায়ের স্বপ্নপূরণের গল্প। সৌমজিৎ-এর মা মুনমুন বোস, পেশায় একজন সাধারণ পোশাক বিক্রেতা। সংসারের নানা প্রতিকূলতা, আর্থিক চাপ এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তিনি কখনও ছেলের স্বপ্নকে থামতে দেননি। দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে ছেলের প্রশিক্ষণ, যাতায়াত ও প্রতিযোগিতার খরচ বহন করেছেন তিনি।
মুনমুন দেবীর কাছে হয়তো বিলাসিতার সুযোগ ছিল না, কিন্তু ছিল এক অদম্য ইচ্ছাশক্তি—ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করে তোলা এবং তার স্বপ্নের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা। সেই মায়ের ত্যাগ ও ভালোবাসার প্রতিদান আজ জাতীয় মঞ্চে সোনালি অক্ষরে লিখে দিল সৌমজিৎ।
এই সাফল্যে গর্বিত সৌমজিৎ-এর মামা প্রবীর সরকার-ও। তিনি জানান, পরিবারের কেউ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও, সৌমজিৎ-এর ইচ্ছাশক্তি এবং মুনমুন দেবীর লড়াই দেখে তাঁরা সবসময় তার পাশে থেকেছেন। আজ সৌমজিৎ-এর এই অর্জন গোটা পরিবারের কাছে এক আবেগঘন মুহূর্ত।
অন্যদিকে, শিক্ষক সেখ ইসমাইল সেনসাইয়ের প্রশিক্ষণে পূর্ব বর্ধমানের ছাত্রছাত্রীরা জাতীয় স্তরে সর্বাধিক পুরস্কার জিতে অল ইন্ডিয়া জে কে চ্যাম্পিয়নশিপের বড় ট্রফি নিজেদের দখলে নিয়েছে। জেকেএডব্লিউএফ আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাপান থেকে আগত সাতোসি তাকাহাসি সিহান সেনসাই।
সৌমজিৎ-এর এই জয় প্রমাণ করে দেয়, সাফল্যের জন্য শুধু প্রতিভাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিবারের সমর্থন, শিক্ষকের সঠিক দিশা এবং এক মায়ের অশেষ ত্যাগ। পোশাক বিক্রি করে সংসার চালানো সেই মায়ের চোখের জল আজ আনন্দের অশ্রুতে পরিণত হয়েছে।

পূর্ব বর্ধমানের মাটিতে জন্ম নেওয়া এই সোনার ছেলে আজ শুধু পদক জেতেনি, জিতেছে হাজারো সংগ্রামী মায়ের হৃদয়।
মায়ের হাত ধরে শুরু হওয়া পথচলা আজ জাতীয় মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছে সৌমজিৎকে। আর সেই কারণেই এই জয় শুধু একজন খেলোয়াড়ের নয়, এটি এক মায়ের অদম্য লড়াইয়ের জয়।












