কৃষ্ণ সাহা , পুরী :
ওড়িশার পুরীতে মহাসমারোহে পালিত হচ্ছে বিশ্ববিখ্যাত শ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রা। হিন্দু ধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই উৎসবকে ঘিরে দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত পুরীতে সমবেত হয়েছেন। সকাল থেকেই শ্রীমন্দির চত্বর ও বড়দণ্ডে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। কড়া নিরাপত্তা, চিকিৎসা পরিষেবা এবং প্রশাসনিক নজরদারির মধ্যেই শুরু হয় মহাপ্রভুর রথযাত্রা।


ঐতিহাসিক ‘পাহান্ডি’ প্রথা
রথযাত্রার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল ‘পাহান্ডি বিজে’। এই প্রাচীন রীতি অনুযায়ী শ্রীজগন্নাথ, বড়ভাই বলভদ্র, বোন সুভদ্রা এবং সুদর্শন চক্রকে শ্রীমন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে দুলতে দুলতে হাজার হাজার ভক্তের জয়ধ্বনি, শঙ্খধ্বনি ও করতালির মধ্যে রথে আনা হয়। এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে প্রতি বছর অসংখ্য ভক্ত পুরীতে ভিড় জমান।
শ্রীজগন্নাথের রথ – নন্দিঘোষ
উচ্চতা: প্রায় ৪৫ ফুট
চাকা: ১৬টি
রঙ: লাল ও হলুদ
পতাকার নাম: ত্রৈলোক্যমোহিনী
সারথি: দারুক
রক্ষী: গরুড়
অশ্ব: শঙ্খ, বলাহক, শ্বেত ও হরিদাশ্ব
এই রথে শ্রীজগন্নাথের সঙ্গে আরও ৯ জন দেবতা অধিষ্ঠিত থাকেন, তাঁদের মধ্যে নরসিংহ, রাম, কৃষ্ণ, নারায়ণ, হনুমান, গোবর্ধন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
বলভদ্রের রথ – তালধ্বজ
উচ্চতা: প্রায় ৪৪ ফুট
চাকা: ১৪টি
রঙ: লাল ও সবুজ
পতাকার নাম: উন্নয়নী
সারথি: মাতলি
রক্ষী: বাসুদেব
অশ্ব: তীব্র, ঘোর, দীর্ঘশ্রম ও স্বর্ণনাভ
বলভদ্রের সঙ্গে এই রথে আরও ৯ জন দেবতা অবস্থান করেন।
সুভদ্রার রথ – দর্পদলন (দেবদলন)
উচ্চতা: প্রায় ৪৩ ফুট
চাকা: ১২টি
রঙ: লাল ও কালো
পতাকার নাম: নাদাম্বিকা
সারথি: অর্জুন
রক্ষী: জয়দুর্গা
দেবী সুভদ্রার সঙ্গে সুদর্শন চক্রও এই রথে বিরাজ করেন।
রথ নির্মাণের বিশেষত্ব
প্রতি বছর অক্ষয় তৃতীয়ার দিন থেকে নির্দিষ্ট নিমকাঠ দিয়ে নতুন করে তিনটি রথ নির্মাণ করা হয়। শতাব্দীপ্রাচীন নিয়ম ও শাস্ত্র মেনে দক্ষ কারিগররা এই রথ তৈরি করেন। রথযাত্রা শেষে নির্দিষ্ট সময়ে রথগুলি ভেঙে ফেলা হয় এবং পরের বছর আবার নতুন রথ নির্মাণ করা হয়।

কড়া নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে ওড়িশা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। হাজার হাজার পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী, ড্রোন নজরদারি, সিসিটিভি, মেডিক্যাল ক্যাম্প, অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে লক্ষাধিক ভক্ত নির্বিঘ্নে মহাপ্রভুর দর্শন করতে পারেন।

ভক্তদের বিশ্বাস
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, রথযাত্রায় মহাপ্রভুর দর্শন ও রথের দড়ি টানার সৌভাগ্য অর্জন করলে জীবনের পাপ মোচন হয় এবং ভগবান জগন্নাথের বিশেষ আশীর্বাদ লাভ করা যায়। তাই প্রতিবছর এই উৎসবকে ঘিরে ভক্তদের উচ্ছ্বাস ও আবেগ থাকে তুঙ্গে।










