
কৃষ্ণ সাহা , রায়না:
আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজের জন্য নয়, অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই খুঁজে পান জীবনের সার্থকতা। সাধারণ মানুষের ভিড়েও তাঁরা হয়ে ওঠেন অসাধারণ। পূর্ব বর্ধমানের রায়না-২ ব্লকের অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের সুপারভাইজার নন্দিতা পাল চৌধুরী সেই বিরল মানুষদেরই একজন।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসহায় শিশু, দরিদ্র পরিবার ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে নিরলসভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। বাল্যবিবাহ রোধে বাড়ি বাড়ি প্রচার, পথনাটিকার মাধ্যমে সচেতনতা, শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম—সব ক্ষেত্রেই তাঁর মানবিক উদ্যোগ এলাকাজুড়ে প্রশংসিত।
সম্প্রতি আরুই গ্রাম পঞ্চায়েতের ২১৩ নম্বর আইসিডিএস কেন্দ্র, পাষণ্ডা গ্রামে এক আবেগঘন অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তিনি। সেখানে এক শিশুর অন্নপ্রাশন সম্পন্ন হয়, যার জীবনের গল্প অত্যন্ত বেদনাদায়ক। শিশুটির মায়ের বিয়ে হয়েছিল মাত্র ১৪ বছর বয়সে। সেই সময় নন্দিতা পাল চৌধুরী প্রাণপণ চেষ্টা করে ওই কিশোরীকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে সংসার জীবনে ফিরে এলেও সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সেই তরুণীর মৃত্যু হয়। আজ সেই অনাথ শিশুটির দায়িত্ব নিজের সন্তানের মতোই কাঁধে তুলে নিয়েছেন নন্দিতা পাল চৌধুরী।
শুধু ওই শিশুই নয়, একই অনুষ্ঠানে আরও দুই শিশুর অন্নপ্রাশনেরও আয়োজন করেন তিনি। ফুলের মালা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, পায়েস, মিষ্টি ও নানা রকম খাবারের মধ্য দিয়ে এক পারিবারিক পরিবেশে সম্পন্ন হয় অনুষ্ঠান। শিশুদের মুখের হাসিই যেন হয়ে ওঠে দিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

নন্দিতা পাল চৌধুরী জানান,
“আমার অসুস্থ সন্তানের জন্মদিন উপলক্ষে এই মাসে যেসব শিশুর অন্নপ্রাশন হচ্ছে, তাদের প্রত্যেককে আমি একটি করে কাঁসার বাটি ও একটি চামচ উপহার দিচ্ছি। ওদের হাসিই আমার সবচেয়ে বড় উপহার।”

এটাই প্রথম নয়। এর আগেও বহু অসহায় শিশুর চিকিৎসা, পড়াশোনা ও প্রয়োজনীয় খরচ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বহন করেছেন তিনি। সরকারি দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে মানবিকতার যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।
সমাজে আমরা মাটির প্রতিমার পূজা করি। কিন্তু মানুষের সেবায় নিজেকে নিঃস্বার্থভাবে উৎসর্গ করে চলা এমন মানুষরূপী প্রতিমাদের সম্মান জানানোও আমাদের কর্তব্য। রায়না-২ ব্লকের অঙ্গনওয়াড়ি সুপারভাইজার নন্দিতা পাল চৌধুরী প্রমাণ করে দিয়েছেন, মানবসেবাই পরম ধর্ম। তাঁর মতো মানুষদের জন্যই আজও মানবতার আলো নিভে যায়নি।











