রাণীগঞ্জ/কলকাতা: “রাতভর একের পর এক লাশকে নিয়ে আসতে দেখেছি। বারবার দৌড়ে গিয়েছি কেউ আসছে জানতে পেরে। অ্যাম্বুলেন্সকে একের পর এক ফলো করছি। কোথাও খুঁজে পাইনি মেসোমশাইকে।” বৃহস্পতিবার দুপুরে এসএসকেএম হাসপাতালের মর্গে মেসো নবীন সিং-এর নিথর দেহ শনাক্ত করার পর কান্নায় ভেঙে পড়ে কথাগুলো বলছিলেন ভাগ্নি সিমরন। “দেহ থেঁতলে গিয়েছে, মুখ দেখলে চেনা যায় না। তবে হাতের উলকিটা দেখেই জানলাম মেসো আর নেই।” বুধবার দুপুরে তারাতলায় নির্মীয়মান কারখানা ধসে নিখোঁজ হন রাণীগঞ্জের লায়েক বাঁধ ৩নং ধাওড়ার বাসিন্দা নির্মাণ শ্রমিক নবীন সিং। খবর পেয়ে স্বামীর খোঁজে কলকাতায় ছোটেন স্ত্রী নেহা দেবী, বড় ছেলে প্রিন্স ও বোনের মেয়ে সিমরন।

মাসি ও ভাইকে সঙ্গে নিয়ে দিনরাত এক করে এসএসকেএম ও ধসে যাওয়া কারখানার সামনে ঘুরেছেন তাঁরা। শেষমেশ বৃহস্পতিবার দুপুরে প্লাস্টিক মোড়া কফিনে নবীনের দেহ পান। স্ত্রীর অভিযোগ: “পরিকল্পনা করে মেরে ফেলা হয়েছে” নবীন সিং-এর স্ত্রী নেহা দেবীর অভিযোগ, “একেবারে যেন পরিকল্পনা করে তাদের মেরে দেওয়া হল। এতগুলো মানুষ একসঙ্গে মরে যাওয়া যেন একটা পরিকল্পনার কারণে হয়েছে। কারণ মালিক তো জানতোই যে নিচের কাঠামোটা মজবুত নেই, খুব নরম মাটিতে রয়েছে সব স্ট্রাকচার। তবুও কিভাবে বহুদিন ধরে পড়ে থাকা কারখানার ওপরে কংক্রিট দিয়ে ঢালাইয়ের কাজ চলছিল?” নেহা দেবী জানান, “আমাকে মাঝে মাঝে স্বামী দেখাতো কতটা ভয়াবহ অবস্থায় কাজ করতে হয় তাদের।
কঠিন পরিশ্রম করে ছোট্ট লোহার সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যেতে হয়, তারপর জীবনকে বাজি রেখে চলে নির্মাণের কাজ। এইসব দেখে তাকে কাজ ছেড়ে বাড়িতে চলে আসতে বলেছিলাম। আগে হয়তো আমার কথা শুনে চলে এলে এমনটা হতো না।””কীভাবে চলবে সংসার?” “বাড়িতে রোজগারের ওই একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন। এখন বৃদ্ধ শ্বশুরমশাই ও তিন নাবালক ছেলে-মেয়ে নিয়ে আমি কি করবো? কেমন ভাবেই বা চলবে আমাদের সংসার?” চোখে জল নিয়ে প্রশ্ন নেহা দেবীর। দশম শ্রেণির প্রিন্স, সপ্তম শ্রেণির কোমল ও ছোট ছেলে আরিয়ানকে নিয়ে দিশেহারা তিনি।
সরকারি সাহায্যের অপেক্ষায় পরিবার “শুনেছি সরকারের থেকে সহায়তা করা হবে। আহতদের ৫০ হাজার ও মৃত পরিবারগুলিকে দশ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে। তবে আমার কাছে কেউ কিছু বলেনি। কবে করা হবে? কখন করা হবে? কিছুই জানি না।” সরকারের কাছে একটা কাজের আবেদন জানিয়েছেন নেহা। “আমি যদি একটা কিছু কাজ পাই তাহলে কোনোক্রমে তাদের নিয়েই সংসার চালিয়ে নেব।” কলকাতার তারাতলায় ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় মোট ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত ২০-২২ জন। খনি অঞ্চল রাণীগঞ্জের নেহা এখন ভাবলেশহীন। যেন একটা আকাশ ভেঙে পড়েছে তার ওপর। সিমরন জানায়, বুধবার দুপুরে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ডানকুনি থেকে ছুটে আসে সে। “বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যে একটা ভয়-আতঙ্কে দিন কেটেছে, তা বলার নয়। বৃষ্টিতে ভিজে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স আসা লক্ষ্য করে দৌড়ে যাচ্ছি আমরা।”এখন একটাই আশা, সরকার যদি সাহায্য করে। আর কী শাস্তি জোটে ওই কারখানা মালিকের, সেদিকেই তাকিয়ে সকলে।











