আবহাওয়া দক্ষিণবঙ্গ শিক্ষা লাইফ স্টাইল স্বাস্থ্য ভ্রমন ধর্ম কৃষি কাজ ক্রাইম

স্ক্রিনের আলোয় ঢেকে যাওয়া আড্ডার সোনালী বিকেল! প্রযুক্তির অগ্রগতির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে কি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের উষ্ণতা?

krishna Saha

Published :

Golden Afternoon
WhatsApp Channel Join Now

একসময় বিকেল মানেই ছিল এক অন্যরকম আবেগ। দিনের ব্যস্ততা শেষে সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ত, তখনই শুরু হতো মানুষের সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধনের সবচেয়ে প্রাণবন্ত সময়। গ্রামের মেঠোপথ, পুকুরপাড়, বটগাছের ছায়া, শহরের পাড়ার মোড়, চায়ের দোকান কিংবা ক্লাবঘর—সব জায়গাই হয়ে উঠত প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা। কেউ রাজনীতির আলোচনা করতেন, কেউ খেলাধুলার খবর নিয়ে তর্কে মেতে উঠতেন, কেউ আবার জীবনের ছোটখাটো সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতেন প্রতিবেশী বা বন্ধুদের সঙ্গে। সেই সময়টায় মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল সময় এবং সম্পর্ক। ঘরে ঘরে টেলিভিশন থাকলেও তা কখনও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

বরং দিনের শেষে একসঙ্গে বসে গল্প করার মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত আনন্দ। পাড়ার কাকু, জেঠু, দাদারা যেমন আড্ডায় মেতে উঠতেন, তেমনি শিশুরাও মাঠে ছুটে বেড়াত। ফুটবল, ক্রিকেট, দাড়িয়াবান্ধা, কাবাডি, গোল্লাছুট কিংবা লুকোচুরি—খেলার তালিকা ছিল দীর্ঘ। সন্ধ্যা নামার আগে পর্যন্ত মাঠে শিশুদের কোলাহলে মুখর হয়ে থাকত চারপাশ। কিন্তু গত দুই দশকে প্রযুক্তির বিস্ফোরণ মানুষের জীবনযাত্রায় এক আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। কয়েক সেকেন্ডে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের খবর জানা যাচ্ছে, মুহূর্তে যোগাযোগ করা যাচ্ছে হাজার মাইল দূরের মানুষের সঙ্গে। কাজ, শিক্ষা, ব্যবসা, বিনোদন—সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি আজ অপরিহার্য।


তবে এই অভূতপূর্ব অগ্রগতির পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের একাংশ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছেন—প্রযুক্তি কি মানুষকে কাছাকাছি আনার পাশাপাশি বাস্তব জীবনে একে অপরের থেকে দূরেও সরিয়ে দিচ্ছে? আজকের দৃশ্যপট অনেকটাই ভিন্ন। বিকেলের আড্ডা আর আগের মতো জমে না। চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে থাকা কয়েকজন মানুষকে দেখা যায়, কিন্তু তাদের অনেকেই ব্যস্ত নিজের মোবাইল ফোনে। একই টেবিলে বসে থাকা বন্ধুদের মধ্যেও কথোপকথনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করা, ভিডিও দেখা কিংবা ছবি পোস্ট করা। একসময় যে আড্ডা ছিল প্রাণবন্ত আলোচনা, হাসি-ঠাট্টা ও মতবিনিময়ের জায়গা, তা অনেক ক্ষেত্রেই এখন নীরব স্ক্রিন-নির্ভরতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

See also  অনলাইন অঙ্কন প্রতিযোগিতা


পরিবর্তনের এই ঢেউ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে নতুন প্রজন্মের উপর। বর্তমান সময়ের শিশু ও কিশোররা এমন এক পরিবেশে বড় হচ্ছে, যেখানে ডিজিটাল প্রযুক্তি জীবনের শুরু থেকেই তাদের সঙ্গী। মোবাইল ফোন, ট্যাব, অনলাইন গেম, ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের অবসর সময়ের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। একসময় স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা দৌড়ে মাঠে যেত। এখন অনেক শিশু স্কুল থেকে ফিরে সরাসরি মোবাইল বা কম্পিউটারের সামনে বসে পড়ে। ভার্চুয়াল গেমের উত্তেজনা বাস্তব খেলার আনন্দকে অনেক ক্ষেত্রে পিছনে ফেলে দিয়েছে। ফলে শারীরিক পরিশ্রম কমছে, সামাজিক মেলামেশার সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। শুধু শিশু-কিশোররাই নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের জীবনেও প্রযুক্তির প্রভাব গভীর। অফিস থেকে ফিরে অনেকেই সময় কাটান মোবাইল ফোনে। পরিবারে একসঙ্গে বসার মুহূর্তগুলোতেও স্ক্রিনের উপস্থিতি ক্রমশ বাড়ছে। একই ঘরে বসে থেকেও পরিবারের সদস্যরা যেন আলাদা আলাদা ভার্চুয়াল জগতে বিচরণ করছেন। অনেক পরিবারে রাতের খাবারের টেবিলেও কথোপকথনের বদলে দেখা যায় মোবাইলের পর্দায় চোখ রাখা।


সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে আড্ডা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উপাদান। আড্ডা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সামাজিক শিক্ষার ক্ষেত্র, সম্পর্ক গড়ে তোলার জায়গা এবং গণতান্ত্রিক মতবিনিময়ের একটি অনন্য পরিসর। আড্ডার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়, নতুন ধারণা গ্রহণ করে এবং সমাজ সম্পর্কে সচেতন হয়।
বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আড্ডার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাহিত্য, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সামাজিক আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারণার জন্ম হয়েছে আড্ডার আসর থেকে। কলকাতার কফিহাউস থেকে শুরু করে গ্রামের চায়ের দোকান—আড্ডা ছিল চিন্তার বিকাশের এক উর্বর ক্ষেত্র। সেই ঐতিহ্য আজ প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের চাপে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।


মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মানসিক সুস্থতার জন্য বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্ধু, পরিবার এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ, আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক স্থিতি তৈরি করে। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ভার্চুয়াল মাধ্যমে কাটানোর ফলে অনেকের মধ্যে একাকীত্বের অনুভূতি বাড়তে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বাস্তব জীবনে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অভাব তৈরি হতে পারে। গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনেও পরিবর্তন স্পষ্ট। একসময় সন্ধ্যা হলেই উঠোনে বসে গল্প করতেন পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা। গ্রামের মানুষ নিয়মিত একে অপরের বাড়িতে যেতেন, খোঁজখবর নিতেন। আজ সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। প্রযুক্তি যেমন যোগাযোগ সহজ করেছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে মুখোমুখি যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তাও কমিয়ে দিয়েছে।

See also  আগস্ট মাসে ১৭ দিন বন্ধ থাকবে ব্যাঙ্ক


তবে প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকগুলিকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ব্যবসা এবং প্রশাসনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অনলাইন শিক্ষা বহু শিক্ষার্থীর কাছে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ডিজিটাল যোগাযোগ দূরের মানুষকে কাছাকাছি এনেছে। জরুরি মুহূর্তে তথ্য আদান-প্রদানকে করেছে দ্রুত ও সহজ। সমস্যা তাই প্রযুক্তিতে নয়, বরং তার ব্যবহারবিধিতে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করবে, কিন্তু মানুষের জায়গা নেবে না—এই ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন কিছু সময় মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকা, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানো, শিশুদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করা এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করা সম্ভব।


বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকার ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে। অনেক পরিবার সপ্তাহে অন্তত একদিন ‘স্ক্রিন-ফ্রি ডে’ পালন করছে। এর লক্ষ্য হলো পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধি করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো। আমাদের সমাজেও এই বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করেও মানবিক সম্পর্কের উষ্ণতা ধরে রাখা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সচেতন ব্যবহার এবং সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা।
আজও বিকেলের আকাশে সূর্য একইভাবে অস্ত যায়। বাতাসে ভেসে আসে পাখির ডাক, গাছের পাতায় খেলা করে আলো-ছায়ার মায়া। কিন্তু সেই বিকেলের রূপকে উপলব্ধি করার জন্য প্রয়োজন মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ।

স্ক্রিনের আলো যতই উজ্জ্বল হোক, তা কখনও বন্ধুর মুখোমুখি হাসি, পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময় কিংবা পাড়ার আড্ডার উষ্ণতাকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না। প্রযুক্তির এই যুগে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করব, নাকি প্রযুক্তিই আমাদের সামাজিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে? উত্তর খুঁজতে হলে হয়তো আবার ফিরে তাকাতে হবে সেই হারিয়ে যেতে বসা সোনালী বিকেলগুলোর দিকে, যেখানে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল—সে একজন মানুষ, আর তার পাশে ছিল আরেকজন মানুষ।

krishna Saha

আমার নাম কৃষ্ণ কুমার সাহা, আমি ফুল টাইম সাংবাদিকতা করি।গত ৮ বছর ধরে এই পেশায় আছি