আবহাওয়া দক্ষিণবঙ্গ শিক্ষা লাইফ স্টাইল স্বাস্থ্য ভ্রমন ধর্ম কৃষি কাজ ক্রাইম

যাত্রার স্বর্ণাঙ্গুরিয় যাত্রাভিনেতা চন্দন হাটি

krishna Saha

Published :

Jatra actor Chandan Hati
WhatsApp Channel Join Now

শক্তি চট্টোপাধ্যায়:- পশ্চিমবঙ্গের যাত্রা আসরের এক মহাপ্রতিভাবান যাত্রাভিনেতা হলেন চন্দন হাটি । যাত্রামঞ্চ যাঁর মুখ্যপ্রাণ । নিরহঙ্কারী আলাপি সদাহাস্য চন্দন হাটির জগৎ প্রথমে নিজের পূজনীয়া মাতা । তারপর জগৎ । তারপরের ভালোবাসা যাত্রামঞ্চ । যাত্রামঞ্চে অভিনয় তাঁর প্রাণশক্তির প্রকাশ । পেশাদার যাত্রাভিনেতা চন্দন হাটি জন্মগ্রহণ করেন পূর্ব বর্ধমান (তৎকালীন বর্ধমান) জেলার মাধবডিহি থানার আড়ুই গ্রামে । ডাকঘর শোকনাড়া । জন্ম তারিখ ১৯৭৬ সালের ২৮শে জানুয়ারি । বাবার নাম পূজনীয় স্বর্গীয় অসিত হাটি এবং মায়ের নাম পূজনীয়া মধুমাধবীদেবী । চন্দন হাটির শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ । পড়াশুনা গ্রামের পাঠশালার পর বড়বৈনান ইউ এস কে এস শিক্ষানিকেতনে(উচ্চ মাধ্যমিক) । পরিবারে বেশ কিছু ফসলি জমি রয়েছে । তাই চন্দন হাটির পরিবার প্রকৃতই মা মাটি মানুষের পরিবার ।

যাত্রাভিনেতা-নির্দেশকের জন্মটাই হচ্ছে প্রথম থেকে বাঁচার জন্য কঠোর সংগ্রাম । যাকে এককথায় বলে অস্তিত্বের লড়াই । দুঃখের ঘটি সবসময় তাঁর উপুড় হয়েই থাকতো । অভিনেতা চন্দন যখন মাতৃগর্ভে সেই সময়ে অভিনেতা পিতৃহীন হন । অভিনেতার পূজনীয়া মাতৃদেবীর বিবাহ হয় এক বৈশাখে । ঠিক তার আট মাস বাদেই পৌষ মাসে অভিনেতার পূজনীয় পিতৃদেব প্রয়াত হন । আগুনের কালো শিখায় ম্লান হয়ে পড়ে সংসার । দুর্দশা ঘূর্ণির ঢেউ তুলে মাতৃদেবীর সম্মুখীন হয় । পিতৃদেবের বিয়োগে অভিনেতার মাতৃদেবী অকূল পাথারে নিমজ্জিত হন । একদিকে সংসার, অপরদিকে অভিনেতার পিতৃবিয়োগ, মাতৃদেবীর তখন দিশাহীন পাগল অবস্থায় । মাতৃদেবীর বয়স তখন মাত্র কুড়ি । অভিনেতা চন্দন হাটি পৈতৃকসূত্রে বাঁকুড়া জেলার ইন্দাস থানার আমরুল পোস্ট অফিস অন্তর্গত আব্দুলপুর গ্রামের সুসন্তান । ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে জন্মগ্রহণ করেন তাঁর মামাবাড়ি বর্ধমানের রায়না থানার অন্তর্গত আরুইগ্রামে ।

মাতৃ গর্ভে থাকাকালীন অভিনেতার পিতৃদেব বড় আদর করে অভিনেতার নাম রেখে গিয়েছিলেন ‘দেবদুলাল’ । দেবদুলাল নামেই এখনো আব্দুলপুরে অভিনেতা চন্দন হাটির কাঠা দশেক জমি রয়েছে । যেহেতু জন্ম মামার বাড়ি তাই পিতৃদেব প্রদত্ত নাম অভিনেতার ভাগ্যে টিকেনি । টিকে যায় অভিনেতার দাদুর দেওয়া নাম ‘চন্দন’ । তিন বছর পর অভিনেতার মাতৃদেবী যখন কিছুটা ধাতস্থ হন তখন তাঁর পূজনীয়া মাতৃদেবী চন্দনকে আদর করে ‘বাপি’ নামে ডাকতে শুরু করেন । আজও মামাবাড়ির গ্রাম আড়ুই ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে মায়ের দেওয়া নাম ‘বাপি’ বলেই অভিনেতা চন্দন হাটিকে সবাই চেনেন ।

See also  পেট্রোল ডিজেল,রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি,হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে জয়নগরে এস ইউ সির বিক্ষোভ মিছিল

ছোট থেকে আজকের নামজাদা বলিষ্ঠ অভিনেতা-নির্দেশক চন্দন হাটি ভীষণ ডাকাবুকো এবং দুঃসাহসী ছিলেন । পাড়ায় কেউ কোনো বিপদে পড়লে সবার আগে বাপি ওরফে চন্দন এগিয়ে যেতেন । অভিনেতা চন্দন হাটির বন্ধুরা এই দেখে তাঁকে বলতেন যে লোকনাথ বাবাকে ডাকা আর চন্দন হাটিকে ডাকা দুই-ই সমান । একটা সময় রক্তদান করা ছিল অভিনেতার নেশা । আজও প্রয়োজনে হাজার কাজের মাঝেও ছুটে যান রক্ত দিয়ে মুমূর্ষুকে বাঁচাতে । সমাজসেবা ও মুমূর্ষু ব্যক্তিকে উপকার ও সেবা করতে গিয়ে বহু ঝঞ্ঝাটের মুখোমুখি হতে হয়েছিল সমাজসেবী চন্দন হাটিকে । একবার এক অপরিচিত ব্যক্তি দুর্ঘটনায় পড়লে তাঁকে উদ্ধার করে বাড়ি পৌঁছাতে সর্বস্বান্ত হতে হয়েছিল অভিনেতা চন্দনকে । যাত্রায় অভিনয় করবার কারণে আত্মীয়-স্বজনদের কাছেও অনেক বিরূপ ও বাজে মন্তব্য শোনার কারণে রাগে ও অভিমানে আত্মীয়স্বজন ত্যাগ করেছেন অভিনেতা । জন্মদাত্রী মাতৃদেবী, ধরিত্রী মাতৃদেবীর পর অভিনেতার কাছে শ্রদ্ধার মাতৃদেবীর নাম যাত্রা । কারণ অভিনেতার যাত্রা মাতৃদেবী অভিনেতা চন্দনকে তাঁর স্ত্রী দিয়েছেন । সংসার দিয়েছেন । সন্তান দিয়েছেন ।

সন্তানকে শিক্ষা দিতে সাহায্য করে চলেছেন । অভিনেতার জন্মদাত্রী মাতৃদেবীকে বাঁচিয়ে রেখেছেন । অভিনেতার পরিবারকে বাঁচিয়ে রেখেছেন । জীবনে প্রথম একা কলকাতায় গিয়ে হাউ হাউ করে কেঁদেছিলেন । হাওড়ার প্ল্যাটফর্মে বসে কলকাতা কি বস্তু তিনি চিনতেন না । কুড়ি বছর বয়স থেকেই কারো মারফত নয়, কারো হাত ধরে নয়, যা উন্নতি করেছেন জীবনে একা একা । অভিনেতার মায়ের অশেষ আশীর্বাদে বর্তমানে অভিনেতা চন্দন আজ বলিষ্ঠ যাত্রাভিনেতা ও নির্দেশক । কলকাতা আজ অভিনেতার কাছে জলঘাট । সমস্ত অলিগলি মুখস্থ । আজও লতাগুল্মের স্বপ্ন ছায়ায় যাত্রার উন্নতির স্বপ্ন দেখেন চন্দন হাটি ।

পেশাদারি যাত্রায় হাতেখড়ি হয় বিশিষ্ট পালাকার-অভিনেতা সম্মাননীয় উৎপল রায়ের হাত ধরে । অভিনয় শিখেছেন বিশিষ্ট পূজনীয় যাত্রাগুরু ও নির্দেশক-অভিনেতাদের কাছে । যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনল চক্রবর্তী, অশোক দে, শ্যামল চক্রবর্তী, ত্রিদিব ঘোষ, মঞ্জিল ব্যানার্জি, বাবলি ভট্টাচার্য, পীযূষ বিশ্বাস, পল্লব মুখার্জি প্রভৃতি । যাত্রাভিনেতা চন্দন হাটি ২০০২ সালে ছাব্বিশ বছর বয়সে বিশ্ববন্দনা অপেরায় প্রথম পেশাদার যাত্রায় অভিনয় করেন । পালার নাম ‘যমরাজের হেড কোয়ার্টার’ । তার আগে শৈশব অবস্থা থেকেই বিভিন্ন নাটক ও যাত্রাপালায় অভিনয় করেন । শৈশবে ‘ঝড় আসছে’ নাটকে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয়ে দর্শকরা মুগ্ধ হয়েছিলেন ।

See also  প্রাক্তন অধ্যাপকের বাড়ি থেকে উদ্ধার মা-মেয়ের পচাগলা দেহ, রহস্যে মৃত্যু

চন্দন হাটির চেহারা, শারীরিক দক্ষতা, গানের গলা, মুখভঙ্গিমা, বডি অ্যাকটিং ভীষণ চিত্তাকর্ষক । কণ্ঠের প্রতিটি সংলাপ স্পষ্ট ও নির্ভুল উচ্চারণে দর্শক-শ্রোতাদের কানে পৌঁছে যায় । পেশাদার যাত্রাজগতে সাধারণভাবে খলচরিত্রে অভিনয় করতে বেশি পছন্দ করেন চন্দনবাবু । ‘অন্ধ গলির বন্দি পাখী’ যাত্রাপালায় খলনায়ক রজতের সাগরেদ ‘অপূর্ব ‘ চরিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে ভীষণ জনপ্রিয়তা দেয় । চন্দন হাটি অভিনীত বেশ কিছু যাত্রাপালার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল-‘যমরাজের হেড কোয়ার্টার’, ‘অন্ধগলির বন্দি পাখী’, ‘বৌদি নং-১’, ‘বৃদ্ধাশ্রমে কাঁদছে বাবা মা’, ‘রাঙামাটির রঙ্গিলা’, ‘খেলা ভাঙার খেলা’ এবং ‘খুকু আজও বাড়ি ফেরেনি’, ‘পাপকে সাজা দিতে আসছে পূণ্য’ ইত্যাদি । শুধুমাত্র যাত্রাপালা নয়, বেশকিছু সিনেমা এবং সিরিয়ালেও অভিনয় করেছেন এই প্রতিভাবান যাত্রাভিনেতা । তাঁর অভিনীত সিনেমাগুলি হল, অনুপ সেনগুপ্ত পরিচালিত ‘বাংলা বাঁচাও’ (২০১০), মানস বসু পরিচালিত ‘সেদিন কথা হয়েছিল’ ।

রাজা চন্দ পরিচালিত ‘আমিও নেবো চ্যালেঞ্জ’ । তাঁর অভিনীত ধারাবাহিকগুলির মধ্যে হল ইটিভি বাংলায় অংশুমান প্রত্যুষ নির্দেশিত ‘অজানার খোঁজে’(২০০৫), ‘কোন কাননের ফুল’, ‘সাহিত্যের সেরা সময়’, ‘আনন্দময়ী মা’, ‘বৃদ্ধাশ্রম’, ‘আদরের বোন’, ‘নয়নতারা’, ‘ক্যানিংএর নিমু’ । মা, স্ত্রী ও এক সন্তান নিয়ে সংসার অভিনেতা চন্দনের । অভিনেতা চন্দন হাটির স্ত্রী মৌ ব্যানার্জি একজন সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিভাময়ী যাত্রাভিনেত্রী । মাতৃভক্ত অভিনেতা ও নির্দেশক চন্দন হাটি যাত্রাসংস্কৃতির সম্পদ ও বুদ্ধি । অভিনেতা চন্দন হাটি যাত্রাভিমুখী সমস্ত সংস্কৃতির পুরুষ । মাতৃভক্ত যাত্রাচিত্ত যাত্রার প্রতিষ্ঠিত প্রতিভা চন্দন হাটি জানালেন-‘ আমার এই বয়সে এসে আমি একটা জিনিস বুঝেছি, বাবা-মাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাই আসল শ্রদ্ধা ও পুজো । দেবদেবীদের নয় ; জীবনে বাবা ও মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালোবাসা থাকলে পৃথিবীতে যে কোনো কঠিন সংগ্রামেও সহজেই জয়ী হওয়া যায় । কোনো বাধাই বাধা হয়না ।’

krishna Saha

আমার নাম কৃষ্ণ কুমার সাহা, আমি ফুল টাইম সাংবাদিকতা করি।গত ৮ বছর ধরে এই পেশায় আছি