বর্ধমানে STF-এর হানা, রেনেসাঁ উপনগরী থেকে গ্রেফতার যুবক! মোবাইলে মিলেছে শুভেন্দু অধিকারীর কনভয় ও কর্মসূচির তথ্যের দাবি তদন্তকারীদের, জঙ্গি নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য যোগ ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে পূর্ব বর্ধমানের রেনেসাঁ উপনগরী থেকে হামিম মণ্ডল নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, ধৃতের মোবাইল ফোন থেকে শুভেন্দু অধিকারীর কনভয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং যাতায়াত সংক্রান্ত একাধিক তথ্য উদ্ধার হয়েছে।
পাশাপাশি, ধৃতের সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরভিত্তিক একটি জঙ্গি নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য যোগাযোগের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও এই সমস্ত তথ্য এখনও তদন্তাধীন এবং পুলিশ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
বৃহস্পতিবার রাতে বর্ধমানের রেনেসাঁ টাউনশিপে যৌথ অভিযান চালায় STF ও ATS। সূত্রের খবর, টাউনশিপের জিম সেন্টার থেকে হামিম মণ্ডলকে আটক করা হয়।
পরে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তার মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করে তল্লাশি চালানো হয়। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, সেই ডিজিটাল তথ্য থেকেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মিলেছে, যার ভিত্তিতে তদন্ত আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।
জানা গিয়েছে, রেনেসাঁ উপনগরীর রোহিনী অ্যাপার্টমেন্টে পরিবার-সহ ভাড়া থাকতেন হামিম। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কয়েক মাস আগেই পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে সেখানে ওঠেন তিনি। প্রতিবেশীদের মতে, অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের ছিলেন হামিম। এলাকায় কারও সঙ্গে বিশেষ মেলামেশা করতেন না। বাইরের লোকজনের যাতায়াতও চোখে পড়েনি। তাই হঠাৎ করে এত বড় পুলিশি অভিযানের ঘটনায় রীতিমতো হতবাক হয়ে পড়েছেন আবাসনের বাসিন্দারা।
তদন্তকারী সূত্রে দাবি, ধৃতের মোবাইল ফোনে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কনভয়, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং চলাফেরা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষিত ছিল। প্রাথমিকভাবে তদন্তকারীদের অনুমান, বেশ কিছুদিন ধরেই শুভেন্দু অধিকারীকে লক্ষ্য করে কোনও পরিকল্পনা করা হচ্ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ধৃতের সম্ভাব্য যোগাযোগের সূত্র ধরে জম্মু ও কাশ্মীরভিত্তিক একটি জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে কোনও সংযোগ রয়েছে কি না, তাও তদন্তের আওতায় এসেছে। তবে এই সমস্ত বিষয় এখনও তদন্তাধীন এবং পুলিশের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
তদন্তকারীদের সামনে এখন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। হামিম মণ্ডল একাই কাজ করছিলেন, নাকি তাঁর সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত ছিলেন? রাজ্যের ভিতরে বা বাইরে কোনও বৃহত্তর নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে কি না, কিংবা এর পিছনে আরও বড় কোনও নাশকতার পরিকল্পনা ছিল কি না—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তদন্তকারী সূত্রের দাবি। ডিজিটাল ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরাও বাজেয়াপ্ত মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস পরীক্ষা করছেন।
ঘটনার পর থেকেই রেনেসাঁ উপনগরীতে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেকেই অতীতের খাগড়াগড় বিস্ফোরণের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভাড়াটিয়াদের পরিচয় ও নথি যাচাই আরও কঠোরভাবে করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়ানো যায়।
রেনেসাঁ উপনগরীর বাসিন্দা শাশ্বতী চন্দ্র রায় বলেন,
“আমাদের বাড়ির ওপরের তলাতেই পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকত ওরা। পুলিশ এসে তাকে ধরে নিয়ে গেছে। আমরা ভীষণ আতঙ্কে রয়েছি। পুলিশ প্রশাসনের আরও তৎপর হওয়া উচিত। কে কোথা থেকে এসে থাকছে, সেটা নজরে রাখা দরকার। ওরা মা-বাবা এবং তিন ভাইবোন—মোট পাঁচজন এখানে থাকত। ভোটের ফল প্রকাশের আগেই এখানে আসে। শুনেছি ওদের বাড়ি কুসুমগ্রামে। হাওড়ায় ব্যবসা করত বলেও শুনেছি”।
রেনেসাঁ আবাসনের এক নিরাপত্তারক্ষী বলেন,
“আমরা কিছুই জানতাম না। পুলিশ এসে অভিযান চালানোর পরই বিষয়টি জানতে পারি। শুনছি, যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে তার জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ থাকার সন্দেহ রয়েছে। তবে পুলিশ তদন্ত করছে, এর বেশি কিছু বলতে পারব না”।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ধৃতের মোবাইল থেকে উদ্ধার হওয়া তথ্যের সত্যতা, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক এবং সম্ভাব্য উদ্দেশ্য যাচাই করা হচ্ছে। ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যের তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। তবে তদন্তের স্বার্থে পুলিশ এখনও বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেনি।
এই ঘটনাকে ঘিরে পূর্ব বর্ধমান জেলাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দলনেতাকে ঘিরে সম্ভাব্য নিরাপত্তা-হুমকির অভিযোগ এবং জঙ্গি নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য যোগের দাবি সামনে আসায় বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েই দেখছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাচ্ছে না বলে পুলিশি সূত্রের ইঙ্গিত। এখন নজর তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে এবং ধৃতের কাছ থেকে আরও কী তথ্য উঠে আসে, সেদিকেই।










