উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়, কুলতলি : বর্ষার জল তখন মাতলা নদীর বুকে। নদীর স্রোতের সঙ্গে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে একের পর এক কলার ভেলা। কোনও ভেলায় ফুল, ধূপ ও প্রদীপ, কোনওটিতে পুজোর নানা সামগ্রী। আর ঘাটে দাঁড়িয়ে অগণিত মানুষের প্রার্থনা—সংসারে শান্তি আসুক, পরিবার ভালো থাকুক, সাপের ভয় থেকে রক্ষা মিলুক। শনিবার এমনই এক ভিন্ন ছবি দেখা গেল সুন্দরবনের কুলতলির কৈখালী আশ্রম ঘাটে।মা মনসাকে সন্তুষ্ট করতে মাতলা নদীতে কলার ভেলা ভাসানোর বহু পুরনো লোকাচারকে ঘিরে এদিন সকাল থেকেই আশ্রম ঘাটে মানুষের ভিড় জমে ওঠে। ভোরের আলো ফুটতেই বিভিন্ন এলাকা থেকে ভক্তরা এসে হাজির হন। সঙ্গে থাকে সাজানো কলার ভেলা ও পুজোর উপকরণ। ঘাটে পৌঁছে শুরু হয় পুজো-অর্চনা ও প্রার্থনা। এরপর ধর্মীয় রীতি মেনে সেই ভেলা ভাসিয়ে দেওয়া হয় নদীর জলে।
সুন্দরবনের মানুষের কাছে নদী শুধু জলধারা নয়, জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক বাস্তবতা। নদী যেমন জীবিকা দেয়, তেমনই বর্ষায় তার জল ও প্রকৃতির নানা পরিবর্তন নিয়ে আসে নানা আশঙ্কাও। সেই জীবনযাত্রার মধ্যেই বহু বছর ধরে জায়গা করে নিয়েছে মা মনসার আরাধনা।গ্রামবাংলার প্রচলিত বিশ্বাস, বর্ষাকালে সাপের আনাগোনা বাড়ে। তাই সাপের দেবী মা মনসার কাছে প্রার্থনা করলে পরিবার-পরিজন বিপদ থেকে রক্ষা পাবেন। সেই বিশ্বাস থেকেই অনেক পরিবার প্রতি বছর এই বিশেষ দিনে কলার ভেলা ভাসিয়ে থাকেন।এদিন আশ্রম ঘাটে ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি ধরা পড়ে গ্রাম বাংলার চেনা সামাজিক ছবিও। ছোটদের নিয়ে ঘাটে হাজির হন পরিবারের বড়রা। কেউ পুজোয় ব্যস্ত, কেউ নদীর দিকে তাকিয়ে ভেসে যাওয়া ভেলার ছবি দেখছেন। আর নদীর জলে সারি সারি কলার ভেলা যেন মুহূর্তের জন্য মাতলার বুককেই পরিণত করে এক চলমান লোকসংস্কৃতির মঞ্চে।এই আচারকে ঘিরে রয়েছে নানা লোকবিশ্বাস।

অবশ্য সাপের উপদ্রব কমানোর সঙ্গে এই ধর্মীয় আচারের কোনও বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক প্রমাণিত নয়। কিন্তু বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের সেই ভিন্ন জায়গার বাইরেও এই প্রথার রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক মূল্য। কারণ, প্রজন্ম বদলালেও সুন্দরবনের গ্রামীণ সমাজে আজও টিকে রয়েছে এই লোকাচার। বিশেষ করে নদী ও জঙ্গলে ঘেরা সুন্দরবনের মতো অঞ্চলে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। সেই সম্পর্কেরই এক সাংস্কৃতিক প্রকাশ দেখা যায় মা মনসার পুজো ও কলার ভেলা ভাসানোর মতো আচার গুলিতে। এখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে থাকে নদীকে ঘিরে মানুষের আবেগ, ভয়, আশা এবং ভালো থাকার আকাঙ্ক্ষা।কৈখালীর আশ্রম ঘাটে শনিবারের আয়োজন তাই শুধু একটি দিনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়ে থাকল না। মাতলার জলে ভেসে যাওয়া প্রতিটি কলার ভেলার সঙ্গে যেন ভেসে চলল বাংলার বহু পুরনো এক লোকঐতিহ্য—যে ঐতিহ্যে রয়েছে বিশ্বাস, রয়েছে সংস্কৃতি, আর রয়েছে সুন্দরবনের মানুষ ও প্রকৃতির দীর্ঘ সহাবস্থানের গল্প।











