আবহাওয়া দক্ষিণবঙ্গ শিক্ষা লাইফ স্টাইল স্বাস্থ্য ভ্রমন ধর্ম কৃষি কাজ ক্রাইম

অমৃত ভারতের ‘উজ্জ্বল’ আলোয় নিভল শত পরিবারের উনুন: শান্তিপুরে রেলওয়ে প্লাটফর্মে অস্থায়ী দোকান উচ্ছেদের কান্নায় ভারী বাতাস

krishna Saha

Published :

WhatsApp Channel Join Now

উন্নয়নের জন্য ব্যবহৃত ছেনি-হাতুড়ির আনন্দের শব্দ আর পুরনোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার আর্তনাদ—সবার কানে হয়তো একইভাবে পৌঁছায় না। রেলের আধুনিকীকরণের জোয়ারে যখন সেজে উঠছে স্টেশন, ঠিক তখনই স্টেশন চত্বর থেকে বিদায় নিচ্ছে তিন-চার দশক ধরে আঁকড়ে থাকা একরাশ দীর্ঘশ্বাস। ‘অমৃত ভারত স্টেশন’ প্রকল্পের হাত ধরে শান্তিপুর রেলওয়ে স্টেশন হয়তো আগামী দিনে আধুনিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হতে চলেছে, কিন্তু তার পেছনে জলছাপ হয়ে থেকে যাচ্ছে কয়েকশো হকার ও ছোট দোকানদারের চোখের জল।


দীর্ঘদিন ধরে প্ল্যাটফর্মে চা, জল, ফল কিংবা ছোটখাটো খাবার বিক্রি করে জীবন চালানো এই মানুষগুলো প্রতিটি ভোটের আগে জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে শুধু আশ্বাসই পেয়ে এসেছেন। বিপদের দিনে আজ আর কাউকে পাশে পাওয়া যায়নি। উল্টে জুটেছে সামাজিক বিদ্রুপ—“এতদিন দোকান করেও একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে পারলে না?” কিংবা “হকারের বাড়িতে ফ্রিজ-মোটরসাইকেল আছে!” এই ধরনের মন্তব্যকারীদের হয়তো জানা নেই, বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে একটি স্থায়ী দোকান ঘরের দাম ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকা। সামান্য চা-জল বিক্রি করে পরিবার চালিয়ে এই বিপুল অর্থ জোগাড় করা আকাশকুসুম কল্পনা মাত্র।


বুলডোজারের আগেই ‘লক্ষ্মী’কে সসম্মানে বিদায়রেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দোকান সরিয়ে নেওয়ার বারংবার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। চূড়ান্ত সময়সীমা ছিল আগামীকাল পর্যন্ত। কিন্তু এই সমাজের চরম উদাসীনতা তারা অনেক আগেই বুঝে গিয়েছেন। তাই রেলের বুলডোজার এসে তাদের উপার্জনের শেষ সম্বল ‘লক্ষ্মী’কে পিষে মারুক—তা চাননি শান্তিপুরের হকাররা। ৩০, ৪০ বা ৫০ বছর ধরে দুই পুরুষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকা ভিটে নিজেরাই চোখের জলে খালি করে দিচ্ছেন তারা। ফিরে যাচ্ছেন উপার্জনের এক চরম অনিশ্চয়তার বাড়িতে, যেখানে শিশু, কিশোর কিংবা বৃদ্ধ বাবা-মা পথ চেয়ে বসে আছেন। আগামীকাল থেকে উনুন জ্বলবে কী করে, তা জানা নেই কারও।


শেষ মরিয়া চেষ্টা হিসেবে শান্তিপুরের সাংসদ জগন্নাথ সরকারের কাছে লিখিতভাবে নিজেদের আকুল আবেদন জানিয়েছেন উচ্ছেদ হওয়া ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি—চাকরি নয়, অন্তত একটা টেবিল-চেয়ার পেতে যাতে তারা ব্যবসাটুকু চালিয়ে যেতে পারেন, যাতে পরিবারের মুখে দুটো অন্ন তুলে দেওয়া যায়। সাংসদ চেষ্টা করবেন বলে আশ্বস্ত করলেও, অনিশ্চয়তার মেঘ কাটেনি দোকানদারদের মন থেকে। অনেকের আক্ষেপ“প্রথম যখন আমরা পেটের দায়ে সরকারি জায়গায় দোকান দিতে বসি, তখন প্রশাসনের এই তৎপরতা থাকে না। বছরের পর বছর ব্যবসা করিয়ে আমাদের যখন অভ্যস্ত করে দেওয়া হয়, তখন হঠাৎ এভাবে উচ্ছেদ করা মানে আমাদের মুখের ভাত কেড়ে নেওয়া।”

See also  পুলিশকে আক্রমণ ও গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার নিদান বিজেপি নেতা শ্যামল রায়ের

যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য বনাম পেটের টান উচ্ছেদ হওয়া ব্যবসায়ীদের স্পষ্ট বক্তব্য, তারা রেলের উন্নয়ন বা যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্যের বিরোধী নন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে রেলের অতীত ভূমিকা নিয়ে। যখন একের পর এক ভুঁইফোড়ের মতো দোকান গজিয়ে উঠছিল, তখন কর্তৃপক্ষ কেন উদাসীন ছিল? সেই সময়ই রাশ টানলে আজ এতগুলো পরিবারকে পথের ভিখারি হতে হতো না।আজকের এই উচ্ছেদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অসহায় মানুষেরা। কেউ স্বামীহারা বিধবা, কেউবা শারীরিক প্রতিবন্ধকতাযুক্ত, আবার কেউবা এই দোকানের আয়ের ওপর ভরসা করে লোন নিয়ে সামান্য মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছিলেন। এক লহমায় সব শেষ হয়ে গেল।রেল কর্তৃপক্ষের স্বল্পমূল্যে দোকান বরাদ্দের নিয়মের পেছনেও রয়েছে এক তিক্ত অভিজ্ঞতা। হকাররা জানাচ্ছেন, ডিজিটাল পদ্ধতিতে আবেদন হওয়ায় সারা ভারতবর্ষের মানুষ এই শান্তিপুর স্টেশনের দোকানের জন্য টেন্ডার জমা দিচ্ছেন। ফলে প্রান্তিক স্তরের এই হকারদের দোকান পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাছাড়া, মাসে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা ভাড়া দেওয়ার পর সামান্য চা-বিস্কুট বিক্রি করে কতটুকুই বা লাভ থাকবে, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।

শুধু স্টেশনের দোকানই নয়, ট্রেনের ভেতরে হকারি করাও এখন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে উপার্জনের সমস্ত দরজাই আজ এই মানুষগুলোর জন্য বন্ধ। খোলা রয়েছে শুধু ঝাঁ চকচকে স্টেশন আর উন্নয়ন দেখার দুটি চোখ। আগামী দিনের শান্তিপুর স্টেশন হয়তো আলোয় ঝলমল করবে, কিন্তু তার প্রতিটি কোণায় মিশে থাকবে এক চরম বঞ্চনা আর ভাতের লড়াই হেরে যাওয়ার দীর্ঘশ্বাস।

krishna Saha

আমার নাম কৃষ্ণ কুমার সাহা, আমি ফুল টাইম সাংবাদিকতা করি।গত ৮ বছর ধরে এই পেশায় আছি