কৃষিক্ষেত্র থেকে রান্নাঘর—সবখানেই আজ প্রযুক্তির আধিপত্য। যন্ত্রের শব্দে ঢেকে গেছে মানুষের হাতের ছোঁয়া, মেশিনের গতিতে হারিয়ে যেতে বসেছে বহু প্রাচীন অভ্যাস। তবু এই আধুনিকতার ভিড়েও বাংলার গ্রামজীবনে এমন কিছু দৃশ্য আজও চোখে পড়ে, যা মনে করিয়ে দেয় শিকড়ের কথা, ঐতিহ্যের কথা। পৌষ সংক্রান্তির মুখে পূর্ব বর্ধমান জেলার রায়না, খণ্ডঘোষ ও জামালপুর ব্লকের গ্রামগুলোতে কান পাতলেই ভেসে আসছে ঢেঁকির সেই চিরচেনা শব্দ—ধুপ ধুপ, ধুপ ধুপ।
শিয়ালী ও কোড়া গ্রামের মাটির উঠোনে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই বসে পড়ছেন গ্রামের মহিলারা। শাড়ির আঁচল গুছিয়ে, মুখে অদ্ভুত এক তৃপ্তির হাসি নিয়ে তাঁরা ঢেঁকিতে চাল ভানছেন। আধুনিক যন্ত্র থাকলেও, পৌষ সংক্রান্তির পিঠেপুলির জন্য তাঁদের পছন্দ ঢেঁকিতে ছাঁটা চালের গুঁড়োই। কারণ, তাঁদের বিশ্বাস—ঢেঁকিতে ভানা চালের পিঠের স্বাদ শুধু আলাদা নয়, অনেক বেশি আপন, অনেক বেশি টেকসই।
গ্রামের বয়স্ক গৃহবধূরা বলেন, ঢেঁকিতে চাল ভানলে তার গন্ধ, তার মোলায়েম ভাব পিঠেতে আলাদাই রকমের প্রাণ এনে দেয়। চিতই পিঠে, পাটিসাপটা কিংবা দুধপুলি—সবেতেই ঢেঁকিতে ভানা চালের ছোঁয়ায় ফিরে আসে শৈশবের স্বাদ, মায়ের হাতের রান্নার স্মৃতি। তাই যন্ত্রের সহজলভ্যতা সত্ত্বেও, এই কয়েকটা দিনে ঢেঁকিই হয়ে ওঠে গ্রামের কেন্দ্রবিন্দু।
এখন অনেক গ্রামেই ঢেঁকি আর আগের মতো নেই। কোথাও একটি, কোথাও দু’টি—সেই একমাত্র ঢেঁকিকে ঘিরেই ব্যস্ততা তুঙ্গে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পালা করে চাল ভাঙছেন মহিলারা। শুধু নিজেদের প্রয়োজনে নয়, আশপাশের গ্রাম থেকেও অনেকে ঢেঁকিতে চাল ভাঙাতে আসছেন। এতে যেমন ঐতিহ্য বাঁচছে, তেমনই কয়েকজনের রুজি-রোজগারের পথও তৈরি হচ্ছে।
স্মার্টফোনের যুগে, সোশ্যাল মিডিয়ার রিল আর স্ক্রলের মাঝে, মাটির দাওয়ায় বসে ঢেঁকির তালে তালে চাল গুঁড়ো করার এই দৃশ্য যেন সময়ের স্রোতকে খানিক থামিয়ে দেয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পরিশ্রম, এই মিলেমিশে কাজ করার আনন্দ আজও গ্রামবাংলার বুকের মধ্যে বেঁচে আছে।
পৌষ সংক্রান্তির এই সময়ে ঢেঁকির শব্দ শুধু চাল ভাঙার আওয়াজ নয়—এ যেন বাঙালির হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতির হৃদস্পন্দন। যতদিন এই শব্দ শোনা যাবে, ততদিন গ্রামবাংলার আত্মা বেঁচে থাকবে—মাটির গন্ধে, মানুষের স্পর্শে আর ঢেঁকির তালে তালে।








