৭ই পৌষ ১৪৩২, মঙ্গলবার বিকেল তিনটে নাগাদ বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে পূর্ব বর্ধমান জেলার, খণ্ডঘোষ থানার কৈয়ড় গ্রাম পঞ্চায়েতের তোড়কোনা পীতাম্বরপুর স্কুল ময়দানে শুরু হলো স্যার রাসবিহারী ঘোষ স্মরণে কৃষি ও সাংস্কৃতিক মেলা। এই বছর মেলা ২৭তম বর্ষে পদার্পণ করল। সুসজ্জিত ও বর্ণাঢ্য র্যালি-টি তোড়কোনা গ্রাম—অর্থাৎ স্যার রাসবিহারী ঘোষের বসতভিটে—প্রদক্ষিণ করে পদ্ম পুকুর সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছয়। তার আগে র্যালি-টি পৌঁছায় স্যার রাসবিহারী ঘোষ প্রতিষ্ঠিত তোড়কোনা জগবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়. সেখানে স্যার রাসবিহারী ঘোষের আবক্ষ মূর্তিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করা হয়। শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করেন তাঁর প্রপৌত্র ড. চন্দ্রচূড় ঘোষ। পরবর্তীতে ফিতে কেটে এবং প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্যার রাসবিহারী ঘোষের বংশধর ড. চন্দ্রচূড় ঘোষ।উল্লেখ্য:- স্যার রাসবিহারী ঘোষ ১৮৪৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর পূর্ব বর্ধমান জেলার খণ্ডঘোষ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। যদিও তাঁর জন্ম খণ্ডঘোষে, শৈশবের একটি বড় অংশ কেটেছে তোড়কোনা গ্রামে। তিনি ছিলেন একাধারে খ্যাতনামা আইনবিদ ও মহান দানবীর।
তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম সদস্য ছিলেন এবং প্রগতির গভীর বিশ্বাসী হলেও যে কোনও ধরনের উগ্র প্রগতিবাদের বিরোধিতা করতেন। তিনি ১৯০৭ সালে সুরাট এবং ১৯০৮ সালে মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।রাসবিহারী ঘোষ বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য (১৮৯১–৯৪, ১৯০৬–১৯০৯) এবং ভারতীয় কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। ১৮৯৬ সালে তিনি ‘অর্ডার অফ দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ার’ (CIE) এবং ১৯০৯ সালে ‘অর্ডার অফ দ্য স্টার অফ ইন্ডিয়া’ (CSI) সম্মানে ভূষিত হন। ১৪ই জুলাই ১৯১৫ সালে স্যার রাসবিহারী ঘোষ-কে নাইট উপাধিতে সম্মানিত করা হয়।
আইন শিক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ১৮৭৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠাকুর আইন অধ্যাপক হিসেবে ‘ল’স অফ মর্টগেজ ইন ইন্ডিয়া’ বিষয়ে প্রদত্ত তাঁর বক্তৃতাগুলি পরবর্তীকালে মর্টগেজ আইন সংক্রান্ত প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। তিনি ১৮৮৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিএল ডিগ্রি অর্জন করেন।
নিজের পেশাগত জীবনে অর্জিত বিপুল সম্পদের একটি বড় অংশ তিনি দেশ ও সমাজকল্যাণে দান করেন। ১৮৯৪ সালে তিনি তোরকোনায় জগবন্ধু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য তিনি দশ লক্ষ টাকা দান করেন। যাদবপুরে ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন (NCE) প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর অনুদান ছিল ১৩ লক্ষ টাকা, যা পরবর্তীকালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। রাসবিহারী ঘোষ ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম সভাপতি।
এছাড়াও ২০১০ সালে খণ্ডঘোষ ব্লকের উখরিদ গ্রামে স্যার রাসবিহারী ঘোষ মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। নিজ গ্রামে তিনি স্কুল ও হাসপাতালও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর স্মৃতিকে ঘিরেই প্রতিবছর তোড়কোনায় অনুষ্ঠিত হওয়া কৃষি ও সাংস্কৃতিক মেলা স্থানীয় মানুষের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী উৎসবে পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার মেলার শুভ উদ্বোধন উপলক্ষে হাজির হয়েছিলেন,স্যার রাসবিহারী ঘোষে-র প্রোপুত্র ডক্টর চন্দ্রচূড় ঘোষ,জামালপুর বিধানসভার বিধায়ক অলোক কুমার মাঝি,খন্ডঘোষ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি মীর শফিকুল ইসলাম, কৈয়ড় গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান শাজাহান মন্ডল, স্যার রাসবিহারী ঘোষ স্মৃতি রক্ষা কমিটির সম্পাদক পঞ্চানন দত্ত, মেলা কমিটির সম্পাদক রিপন মুন্সী,মেলা কমিটির সভাপতি শ্যামল কুমার দত্ত সহ আরও অন্যান্য বিশিষ্ট জনেরা। মেলা কমিটির সম্পাদক ও সভাপতি জানান মেলা চলবে ছয় দিন ধরে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকছে বিভিন্ন রকমের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।








