সন্ধ্যা নামলেই গ্রামে গ্রামে শিয়ালের উপদ্রব বেড়ে যায়—এই ছবি এখন পূর্ব বর্ধমানের বহু এলাকায় পরিচিত। সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে পা রাখা দায়, একা মাঠে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না অনেকেই। এমনই আতঙ্কের আবহে দিনের আলোয় লোকালয়ের মধ্যে শিয়াল ঢুকতে দেখে স্বাভাবিকভাবেই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন গ্রামের মানুষ। কিন্তু সেই ভয়ের জায়গায় শেষ পর্যন্ত জয় হল মানবিকতার। পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষ ব্লকের সগড়াই গ্রাম পঞ্চায়েতের জুবিলা গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। হঠাৎ করেই গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়ে একটি শিয়াল। প্রথমে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। অনেকেই ভেবে বসেন, শিয়ালের হামলা হতে পারে। তবে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর ধীরে ধীরে ভুল ভাঙে গ্রামবাসীদের। তাঁরা বুঝতে পারেন, শিয়ালটি আক্রমণাত্মক নয়—বরং সে গুরুতর অসুস্থ।
এই উপলব্ধির পরেই ভয় কাটিয়ে অসুস্থ প্রাণীটির পাশে দাঁড়ান গ্রামের মানুষ। কেউ জল নিয়ে আসেন, কেউ খাবারের ব্যবস্থা করেন। শিয়ালটিকে শান্তভাবে রাখা হয়, যাতে তার আরও কোনও ক্ষতি না হয়। এরপর দ্রুত বনদফতরে খবর দেওয়া হলে বনদফতরের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিয়ালটিকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। এই মানবিক উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের জনস্বাস্থ্য কর্মাধ্যক্ষ বিশ্বনাথ রায়। তিনি বলেন, “সাধারণত শিয়াল দেখলে মানুষ ভয় পায়, আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কিন্তু জুবিলা গ্রামের বাসিন্দারা ভয় না পেয়ে অসুস্থ শিয়ালটির পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁরা একটি বিপন্ন বন্যপ্রাণকে রক্ষা করে সত্যিই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন”।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের সকলের কাছে আবেদন, এই ধরনের কোনও বিপন্ন বা অসুস্থ বন্যপ্রাণী দেখলে সঙ্গে সঙ্গে বনদফতরে খবর দিন এবং তার প্রাণ রক্ষার জন্য সচেষ্ট হন। আমাদের বাস্তুতন্ত্রে সব প্রাণীরই সমান প্রয়োজনীয়তা রয়েছে”।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে পূর্ব বর্ধমানের বিভিন্ন গ্রামে শিয়ালের উপদ্রব বেড়েছে। সন্ধ্যার পর শিয়ালের হামলার ভয়ে অনেক এলাকায় একা বাইরে বেরোনো বন্ধ হয়ে গেছে। দল বেঁধে, লাঠি হাতে মাঠে যেতে হচ্ছে কৃষকদের। এমন পরিস্থিতিতে দিনের আলোয় লোকালয়ে শিয়াল দেখা গেলে আতঙ্ক ছড়ানো স্বাভাবিকই।
কিন্তু সেই আতঙ্কের মধ্যেও জুবিলা গ্রামের বাসিন্দারা প্রমাণ করে দিলেন—মানুষ চাইলে ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক হতে পারেন। অসুস্থ শিয়ালটিকে সেবা-যত্ন করে বনদফতরের হাতে তুলে দিয়ে তাঁরা দেখালেন, সহানুভূতি আর সচেতনতার হাত ধরেই বন্যপ্রাণ ও মানুষের সহাবস্থান সম্ভব।
বনদফতরের আধিকারিকরাও গ্রামবাসীদের এই ভূমিকায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, শিয়ালটিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তার উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।








