রাজ্যের অন্যতম স্বনামধন্য মেমারি গ্রামীণ হাসপাতালে কিছু অসাধু ব্যক্তির দাপট ও দাদাগিরিতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ রোগী ও তাঁদের পরিজনেরা—এমনই গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। শুধু সাধারণ মানুষই নন, হাসপাতালের ভিতরে চলা অনৈতিকতা ও দুর্ব্যবহারের ছবি তুলে ধরতে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন এক স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি।
শনিবার মেমারি গ্রামীণ হাসপাতালে নিজেদের ‘হরিদাস পাল’ বলে পরিচয় দেওয়া কয়েকজন ব্যক্তি প্রকাশ্যে এক সাংবাদিকের উপর চড়াও হয় বলে অভিযোগ। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ওই সাংবাদিককে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার পাশাপাশি তাঁর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করা হয়। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত রোগীর পরিজনেরা প্রতিবাদে এগিয়ে আসায় শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয় অভিযুক্তরা।
এই ঘটনা ফের একবার রাজ্যে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং সরকারি হাসপাতালের ভিতরে সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই মেমারি গ্রামীণ হাসপাতালে ওইসব ব্যক্তির দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। রোগী থেকে শুরু করে সাংবাদিক—কাউকেই তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্যে দাদাগিরি চালানোর অভিযোগ উঠছে তাঁদের বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ ধীরে ধীরে জমছে বলেও জানা গেছে।
ঘটনার দিন, অর্থাৎ শনিবার ১৭ জানুয়ারি বেলা বারোটা নাগাদ, ওই সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি তাঁর পরিবারকে নিয়ে মেমারি গ্রামীণ হাসপাতালের আউটডোরে যান চিকিৎসার জন্য। রোগীকে বসিয়ে রেখে তিনি টিকিট কাউন্টারের লাইনে দাঁড়ালে কাউন্টারে কর্মরত কর্মী রোগীকে সামনে না আনলে টিকিট এন্ট্রি করবেন না বলে জানান। বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও অবস্থান অনড় থাকায় সাংবাদিকটি টেলিফোনে হাসপাতালের বিএমওএইচ ডাঃ দেবাশীষ বালার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিএমওএইচ-এর নির্দেশে শেষ পর্যন্ত টিকিট এন্ট্রি হলেও, অভিযোগ—কাউন্টারের কর্মী মেজাজ হারিয়ে সাংবাদিকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।
এই ঘটনার প্রতিবাদ করতেই দূর থেকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন এক বয়স্ক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে ‘হরিদাস পাল’ বলে পরিচয় দেন। তাঁর উদ্ধত আচরণ দেখে সাংবাদিক নিজের পরিচয় দিয়ে ক্যামেরা চালু করতেই ধাক্কাধাক্কি শুরু হয় এবং ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ।
ঠিক সেই সময় হাসপাতালের আউটডোরে উপস্থিত সাধারণ রোগী ও তাঁদের পরিজনেরাও মুখ খুলতে শুরু করেন। তাঁদের অভিযোগ, ওই ব্যক্তি প্রায় প্রতিদিনই হাসপাতালের আউটডোরে রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং ভয় দেখান। প্রশ্ন উঠছে—একজন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হয়েও যদি সাধারণ মানুষের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে এমন অভিজ্ঞতার শিকার হতে হয়, তাহলে প্রতিদিন অসহায় সাধারণ মানুষ কী পরিস্থিতির মধ্যে পড়ছেন?
এ বিষয়ে মেমারি গ্রামীণ হাসপাতালের বিএমওএইচ ডাঃ দেবাশীষ বালা সাংবাদিককে টেলিফোনে জানান, সাধারণ মানুষকে সুষ্ঠু পরিষেবা দিতে তিনি সচেষ্ট এবং ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে হাসপাতালের একজন বা একাধিক কর্মীর আচরণের জন্য পুরো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বিএমওএইচ-এর ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়ছে—যা মোটেই কাম্য নয়। কারণ দায় ব্যক্তিগত আচরণের, গোটা ব্যবস্থার নয়।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ফের একবার উঠে এলো বড় প্রশ্ন—শুধু মেমারি গ্রামীণ হাসপাতাল নয়, রাজ্যের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে কি সাধারণ মানুষ ন্যূনতম সৌজন্য ও মানবিক আচরণ পাওয়ার অধিকার রাখে না?








