জামালপুর, পূর্ব বর্ধমান: পরাধীন ভারতে জন্ম, স্বাধীনতা আন্দোলনের সাক্ষী, হাওড়া ব্রিজ নির্মাণ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ—সব ইতিহাস নিজের চোখে দেখা এক প্রবীণ নাগরিক। স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচন থেকে শুরু করে আজও নিয়মিত ভোট দিয়ে আসছেন। এমনকি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও ভোট দিয়েছেন। তবুও রেহাই মেলেনি। এসআইআর (SIR) শুনানিতে সশরীরে হাজির হওয়ার নোটিশ পাঠানো হল ১০৪ বছর বয়সী প্রবীণ ভোটারকে।
এই ঘটনাকে ঘিরে পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুর বিধানসভার ১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার প্রত্যন্ত গ্রাম বত্রিশবিঘায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। নোটিশপ্রাপ্ত প্রবীণ হলেন ওই গ্রামের আদি বাসিন্দা, ১৩৮ নম্বর বুথের ভোটার শেখ ইব্রাহিম। স্থানীয় বাসিন্দারা নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপকে “অমানবিক” বলে কটাক্ষ করে প্রবীণ ভোটারের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
১০৪ বছর বয়সেও ‘শুনানির’ তলব শেখ ইব্রাহিম জানান, তাঁর জন্ম বাংলা ১৩২৯ সালের মাঘ মাসে। ১৯৯৫ সালের পুরনো ভোটার কার্ডে তাঁর বয়স ৭৫ বছর উল্লেখ রয়েছে। দীর্ঘদিন আগেই স্ত্রী আসেমা বেগম প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর ছয় ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। ছেলেরা সকলেই বত্রিশবিঘা গ্রামে পাশাপাশি বাড়িতে বসবাস করেন এবং পরম যত্নে বৃদ্ধ বাবার দেখভাল করছেন। গ্রামবাসীর কাছেও তিনি অত্যন্ত সম্মানিত।
এমন একজন প্রবীণ নাগরিককে আগামী ২৯ জানুয়ারি জামালপুর বিডিও অফিসে সশরীরে SIR শুনানিতে হাজির থাকতে নির্বাচন কমিশনের তরফে নোটিশ পাঠানো হয়। ওই নোটিশ বাড়িতে পৌঁছে দেন ১৩৮ নম্বর বুথের বিএলও (BLO) শেখ সাবীর আহমেদ।
বিএলও জানান, “তথ্যগত অসঙ্গতি (Logical Discrepancy)” থাকার কারণেই নোটিশ ইস্যু হয়েছে। কমিশন নিযুক্ত এক প্রতিনিধি দাবি করেন, ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে ‘শেখ ইব্রাহিম’, অথচ আধার কার্ডে নাম লেখা ‘ইব্রাহিম শেখ’—এই নামগত পার্থক্য থেকেই সমস্যা।
গ্রামবাসীর প্রশ্ন—কমিশনের নির্দেশ মানা হল না কেন?
এই যুক্তি মানতে নারাজ প্রবীণের পরিবার ও গ্রামবাসীরা। তাঁদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব নির্দেশ অনুযায়ী ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ভোটারদের সশরীরে SIR শুনানিতে হাজিরার নোটিশ দেওয়া নিষিদ্ধ। তাহলে কোন যুক্তিতে ১০৪ বছর বয়সী একজন মানুষকে বিডিও অফিসে ডেকে পাঠানো হল? সোমবার বিকেলে এই ঘটনার কথা প্রকাশ্যে এনে কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন শেখ ইব্রাহিমের ছেলেরা ও আত্মীয়স্বজনেরা।
“আমি হাঁটতেই পারি না”—চোখে জল প্রবীণের ঘরের ভেতর বসে ‘কৃষকসেতু বাংলা’কে শেখ ইব্রাহিম বলেন, “আমি পরাধীন ভারতে জন্মেছি। স্বাধীনতা আন্দোলন দেখেছি, গান্ধীজির ডাকে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মিছিলে গিয়েছি। হাওড়া ব্রিজ তৈরি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ—সব দেখেছি। এখন আমার বয়স ১০৪ বছর। ঠিক করে হাঁটতেই পারি না। তবুও কেন আমাকে সশরীরে বিডিও অফিসে ডাকা হল, বুঝতে পারছি না।” দু’চোখে জল নিয়ে তিনি আরও বলেন, “কমিশনের লোকজন কি আমার বাড়িতে এসে কাগজপত্র যাচাই করতে পারে না?” একই আবেদন জানান তাঁর দুই ছেলে শেখ বাগবুল ইসলাম ও শেখ রায়হান উদ্দিন।
খবর প্রকাশ হতেই তড়িঘড়ি কমিশনের পদক্ষেপ কৃষকসেতু বাংলা এই ঘটনার খবর সংগ্রহ শুরু করতেই নড়েচড়ে বসে জামালপুরের কমিশন নিযুক্ত প্রতিনিধিরা। নির্ধারিত ২৯ জানুয়ারির আগেই মঙ্গলবার ২৭ জানুয়ারি তাঁরা শেখ ইব্রাহিমের বাড়িতে পৌঁছে যান। সেখান থেকেই তাঁর ভারতীয় নাগরিকত্ব সংক্রান্ত যাবতীয় নথি সংগ্রহ করা হয় এবং তাঁকে কোনও দুশ্চিন্তা না করার আশ্বাস দেওয়া হয়।
বিডিওর বিস্ময়কর মন্তব্য এই প্রসঙ্গে জামালপুর ব্লকের বিডিও পার্থসারথী দে-র কাছে জানতে চাওয়া হলে প্রথমে তিনি দায় চাপান বিএলও-র উপর। পরে আবার বলেন, “ভোটারের বয়স জানার মতো কোনও ব্যবস্থা নাকি তাঁদের কাছে নেই। সেই কারণেই ১০৪ বছর বয়সী প্রবীণ নাগরিককে সশরীরে SIR শুনানিতে হাজির হতে নোটিশ পাঠানো হয়ে গিয়েছিল।”
এই বক্তব্য ঘিরেও নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ।








