আবহাওয়া দক্ষিণবঙ্গ শিক্ষা লাইফ স্টাইল স্বাস্থ্য ভ্রমন ধর্ম কৃষি কাজ ক্রাইম

দেবগ্রামের শিবমন্দির: ধ্বংসস্তূপের মাঝে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের আর্তনাদ

krishna Saha

Published :

WhatsApp Channel Join Now

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুমারগঞ্জ ব্লকের বিশ্বনাথপুর গ্রাম, যা স্থানীয়ভাবে দেবগ্রাম নামে পরিচিত, আজ এক নীরব ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে ছয় শতকেরও বেশি পুরনো এক শিবমন্দিরের ভগ্নাবশেষ এখনও টিকে আছে। কিন্তু এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা আজ চরম অবহেলা আর উদাসীনতার শিকার। আমাদের বাঙালি জাতি যেন নিজের অতীতকে ধ্বংস করার শিক্ষা নিখুঁতভাবে রপ্ত করেছে।

একসময় দেবগ্রামের এই শিবমন্দির ছিল স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গ বহু আগেই অদৃশ্য হয়ে গেছে। ভগ্নপ্রায় দেওয়ালগুলোতে আজ জন্মেছে বিলাই হাঁচড়ি গাছ, দেওয়ালে লেপটে আছে গোবর। স্থাপত্যটি জরাজীর্ণ, পরিত্যক্ত, এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত। তবু এই অবশিষ্টাংশই যেন এক মহাকালের সাক্ষ্য বহন করছে।

মন্দিরের গঠনশৈলী মধ্যযুগীয় বাংলার স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করে। ব্যবহৃত ইটের আকার লম্বাটে ও পাতলা, গাঁথুনিতে চুন-সুরকির ব্যবহার স্পষ্ট। দেওয়ালগুলো পুরু ও ভারী, যা পাল-সেন পরবর্তী যুগের স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য। টেরাকোটার ফলক নেই, কিন্তু ইটের স্তরবিন্যাসে এর প্রারম্ভিক মধ্যযুগীয় ধারা স্পষ্ট।

বৃহৎ গাছের শিকড় দেওয়ালের ভেতর প্রবেশ করেছে, যা দীর্ঘকাল ধরে এটি পরিত্যক্ত থাকার ইঙ্গিত দেয়। স্থাপত্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী মন্দিরটি রেখ-দেউল বা ক্ষুদ্র নাগর শিখরধর্মী শৈলীর হতে পারে। শিখর অংশ ভেঙে পড়েছে, গর্ভগৃহের দেওয়াল কোনওমতে টিকে আছে।

সম্ভাব্য নির্মাণকাল ধরা হয় খ্রিস্টীয় ১২শ–১৪শ শতক, অর্থাৎ আজ থেকে ৬০০–৮০০ বছর পূর্বে। বাংলার পাল-সেন উত্তরাধিকার পর্বে আঞ্চলিক হিন্দু সামন্তদের পৃষ্ঠপোষকতায় ইট-নির্ভর স্থাপত্যের বিস্তার ঘটে। এই মন্দির তাই শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার আদি ও মধ্যযুগীয় ইতিহাসের এক মূল্যবান প্রত্নচিহ্ন।

আজ এই মন্দিরের সামনে দাঁড়ালে আনন্দ নয়, বরং গভীর হাহাকার জন্মায়। আমাদের শিকড়, আমাদের ইতিহাস, আমাদের সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা নির্বিকার। ইতিহাস নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক যেন প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে কুরে কুরে খায়।

See also  বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের করলেন তৃণমূলের যুব নেতা অভিষেক

এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের জন্য জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন, ইটের গঠন ও গাঁথুনির বিশ্লেষণ, এবং ঐতিহাসিক সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মন্দিরটিকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এটি শুধুই একটি মন্দির নয়, এটি আমাদের আদি ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।

দেবগ্রামের শিবমন্দির আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি আমাদের শিকড়কে বাঁচাতে পারব? নাকি আমরা ইতিহাসের আদালতে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হব? আসুন, অন্তত শেষবারের মতো সকলে মিলে চেষ্টা করি। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার এই মূল্যবান প্রত্নচিহ্নকে রক্ষা করি।

যদি এখনই সচেতন উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে এই প্রত্নচিহ্ন অচিরেই সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তখন আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। কারণ আমরা দেখেও কিছু করিনি।

এখনই সময় একসাথে এগিয়ে আসার। এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাটিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। ইতিহাস যেন অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।

krishna Saha

আমার নাম কৃষ্ণ কুমার সাহা, আমি ফুল টাইম সাংবাদিকতা করি।গত ৮ বছর ধরে এই পেশায় আছি