বর্ষাকালে ডিভিসির মাত্রাতিরিক্ত জলছাড়ে পূর্ব বর্ধমান জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিজমি কার্যত জলের তলায় চলে গিয়েছিল। বহু চাষির পাকা ধান নষ্ট হয়, সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায় বীজতলা। এর ফলে চরম আর্থিক সংকটে পড়েন হাজার হাজার কৃষক। অথচ এই বিপর্যয়ের পরেও কেন্দ্রীয় সরকার বা ডিভিসির পক্ষ থেকে কোনও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের পাশে দাঁড়াল রাজ্য সরকার। পূর্ব বর্ধমান জেলায় মোট ৩২ হাজার ৭২৫ জন চাষিকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ১২ কোটি ৪৪ লক্ষ ৯৯ হাজার ৯৬৪ টাকা দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ধাপে ধাপে এই অর্থ সরাসরি চাষিদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হচ্ছে।
পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসক আয়েশা রানি এ জানান, ডিভিসির জলছাড়ে জমি জলের তলায় চলে যাওয়ায় জেলার একাধিক এলাকার বীজতলা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সেই সময় রাজ্য সরকারের উদ্যোগে চাষিদের বিনামূল্যে ধানের চারা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের বিমার আওতায় আনতে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রশাসনের আধিকারিকরা মাঠে গিয়ে জমির ক্ষয়ক্ষতি চিহ্নিত করেন এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হয়।
কৃষিদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, খরিফ মরশুমে জেলায় ৪ লক্ষ ২২ হাজার ৮৮০ জন চাষি ফসল বিমার জন্য আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে ১ লক্ষ ২৩ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমি বিমার আওতায় আসে। শুধু ধান নয়, আলুচাষের ক্ষেত্রেও বিমার ওপর জোর দেওয়া হয়। এর আগেই ক্ষতিগ্রস্ত আলুচাষিরা বিমার টাকা পেয়েছিলেন, এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলেন ধানচাষিরাও।
পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের কৃষি কর্মাধ্যক্ষ মেহেবুব মণ্ডল বলেন, “বাম আমলে দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে চাষিদের কপাল চাপড়ানো ছাড়া আর কোনও উপায় থাকত না। কিন্তু এখন সেই দিন নেই। রাজ্য সরকার প্রতিটি মরশুমেই চাষিদের বিমার আওতায় আনার জন্য জোর দিচ্ছে। পঞ্চায়েত স্তরে ক্যাম্প করে চাষিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। তার ফলেই আজ চাষিরা বিমার টাকা পাচ্ছেন”।
রায়না-২ ব্লক সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ডিভিসির ছাড়া জলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল বলে জানান চাষিরা। পাশাপাশি কেতুগ্রাম এলাকায় ধান জমিতে পোকার আক্রমণের ফলে বহু জমির ফসল নষ্ট হয়। সেই সব এলাকার চাষিরাও এবার ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছেন। পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের অধ্যক্ষ মহম্মদ অপার্থিব ইসলাম এই প্রসঙ্গে বলেন, “আমাদের সরকার সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে থাকে। চাষি হোক বা শ্রমিক—কেউ সমস্যায় পড়লে রাজ্য সরকার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ডিভিসি রবি বা বোরো চাষের মরশুমে পর্যাপ্ত জল ছাড়ে না, আর বর্ষার সময় মাত্রাতিরিক্ত জল ছেড়ে চাষের জমি ডুবিয়ে দেয়”।
তিনি আরও বলেন, “কেন্দ্রীয় সরকার যদি সত্যিই চাষিদের কথা ভাবত, তাহলে ডিভিসি কখনও এই ধরনের কাজ করত না। জলাধারগুলির নাব্যতা বাড়ানোর দিকে তাদের কোনও নজর নেই। ঝাড়খণ্ডে ভারী বৃষ্টি হলেই ডিভিসি জল ছেড়ে দেয়, আর তার খেসারত দিতে হয় বাংলার চাষিদের। ডিভিসি সরাসরি চাষিদের ক্ষতি করছে”।
অপার্থিব ইসলামের কথায়, “এই অবস্থায় আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে চাষিদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্তরা শুধু বিমার টাকাই নয়, কৃষকবন্ধু প্রকল্পের আর্থিক সহায়তাও পেয়েছেন। পাশাপাশি সরকার ধান কেনার জন্য আলাদা ব্যবস্থাও করেছে, যাতে চাষিরা ন্যায্য দাম পান”।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী দিনেও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কাজ চলবে। বর্ষার ধাক্কায় বিপর্যস্ত কৃষকদের কাছে রাজ্য সরকারের এই সহায়তা নতুন করে ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে।








