তোড়কোনা গ্রামে সরস্বতী পুজো মানেই শুধুই একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এ যেন সময়কে ছুঁয়ে থাকা এক জীবন্ত ইতিহাস। শীতের সকালে হালকা কুয়াশা ভেদ করে যখন গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় আলপনার নকশা ফুটে ওঠে, তখনই বোঝা যায় শিক্ষার দেবীর আরাধনায় গ্রাম আজ উৎসবের সাজে। পূর্ব বর্ধমান জেলার খণ্ডঘোষ ব্লকের কৈয়ড় গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত এই ছোট্ট গ্রামটির বুকে আজও অটুট রয়েছে ত্রিশ বছরেরও অধিক পুরোনো এক ঐতিহ্য—স্যার রাসবিহারী ঘোষ মেমোরিয়াল ক্লাবের সরস্বতী পুজো।
এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের গভীর ছাপ। কারণ তোড়কোনা গ্রামই ছিল প্রখ্যাত আইনবিদ ও দানবীর স্যার রাসবিহারী ঘোষের মামার বাড়ি। সমাজসেবায়, শিক্ষাবিস্তারে ও মানবিক কাজে তাঁর অবদান আজও এলাকার মানুষ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তাঁর স্মৃতিকে বহন করে আজও দাঁড়িয়ে আছে সেই বসতবাড়ি—যা বর্তমানে সংস্কারের পথে। সময়ের সঙ্গে কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও, সেই বাড়ির প্রতিটি ইট-পাথরে যেন লুকিয়ে রয়েছে শিক্ষার প্রতি এক অনমনীয় ভালোবাসা।
এই মানবিক ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্বের নামেই গড়ে উঠেছে স্যার রাসবিহারী ঘোষ মেমোরিয়াল ক্লাব। আর সেই নামেই প্রতিবছর আয়োজন করা হয় সরস্বতী পুজো—যা ধীরে ধীরে গ্রামের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এখানে দেবী সরস্বতী কেবল পূজিত হন না, তিনি হয়ে ওঠেন জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার প্রতীক।
পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয় বহুদিন আগেই। বাঁশ কাটানো থেকে প্যান্ডেলের কাঠামো, মাটির আলপনা থেকে প্রতিমার সাজ—সবকিছুই নিজেদের হাতে করেন ক্লাবের সদস্যরা। কোনও বাহুল্য নেই, কোনও কৃত্রিম চাকচিক্য নেই—শুধু আছে আন্তরিকতা আর পরিশ্রম। রাত জেগে কাজ করার ক্লান্তি থাকলেও, সেই ক্লান্তির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অনির্বচনীয় আনন্দ। ক্লাব সদস্য বাচ্চু চক্রবর্তী বলেন, “এই ক’টা দিন আমাদের কাছে আলাদা। বাড়ি-সংসার ভুলে সবাই ক্লাবেই থাকি। একসাথে খাওয়া, একসাথে কাজ করা, আবার রাতে বসে আড্ডা—এগুলোই আমাদের পুজোর আসল আনন্দ”।
এই অনুভূতিতে সহমত পোষণ করেন ক্লাবের অন্যান্য সদস্য শ্রীকান্ত মণ্ডল,ভগবান বসু, ঝন্টু মাথুর, তারাপদ মাথুর ও অতনু মাথুর। তাঁদের মতে, এই পুজো শুধু উৎসব নয়, নতুন প্রজন্মকে একসাথে কাজ করা, ঐতিহ্যকে সম্মান করা এবং গ্রামের ইতিহাসকে জানতে শেখায়।
সরস্বতী পুজোকে কেন্দ্র করে গোটা তোড়কোনা গ্রাম যেন এক সুতোয় বাঁধা পড়ে। ছোটরা নতুন খাতা নিয়ে আসে, বড়রা স্মৃতিচারণায় মেতে ওঠে। বাড়ির উঠোনে উঠোনে চলে ভোগ রান্নার প্রস্তুতি। উৎসবের আবহ শুধু ক্লাব চত্বরে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এই উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা। দানবীর স্যার রাসবিহারী ঘোষ কর্তৃক তাঁর পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী তোড়কোনা জগবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়েও প্রতিবছরের মতো এবারও যথাযোগ্য মর্যাদায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে সরস্বতী পুজো। ফলে শিক্ষা ও সংস্কৃতির বন্ধন আরও দৃঢ় হয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই ধারায় যুক্ত থাকে।
ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে অবিচ্ছিন্নভাবে চলে আসা এই পুজো প্রমাণ করে দেয়—ঐতিহ্য মানে শুধু অতীতকে আঁকড়ে ধরা নয়, বরং ইতিহাসকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়া। শিক্ষার আলো, মানবিকতার শিক্ষা ও সংস্কৃতির শিকড়—এই তিনের মিলনেই তোড়কোনার সরস্বতী পুজো আজও নিজস্ব মহিমায় উজ্জ্বল।
তোড়কোনার এই সরস্বতী পুজো তাই শুধু একদিনের উৎসব নয়, এটি এক চলমান ইতিহাস—যেখানে প্রতিটি আলপনার রেখা, প্রতিটি প্রদীপের আলো আর প্রতিটি মানুষের স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে শিক্ষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও মানবিকতার বার্তা।








