আবহাওয়া দক্ষিণবঙ্গ শিক্ষা লাইফ স্টাইল স্বাস্থ্য ভ্রমন ধর্ম কৃষি কাজ ক্রাইম

ঘুড়ির সুতোর টানে আকাশে উড়ে যায় বর্ধমান

krishna Saha

Published :

WhatsApp Channel Join Now

পৌষ সংক্রান্তি আসে শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়—সে আসে হিমেল বাতাসে, রোদের মোলায়েম স্পর্শে আর বর্ধমান শহরের ছাদে ছাদে জমে ওঠা উচ্ছ্বাসে। এই দিনটিতে বর্ধমান শহর যেন এক মুহূর্তে নিজের বয়স ভুলে যায়। শতবর্ষের ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শহরটি শিশুর মতো দৌড়োয় আকাশের দিকে—ঘুড়ির সুতোর টানে।

বাঙালির পৌষ মানেই পিঠে-পুলি, টুসু গান, নতুন ধানের গন্ধ। কিন্তু বর্ধমানে পৌষ সংক্রান্তি মানেই আকাশ উৎসব। চিকন কঞ্চির ফ্রেমে জড়িয়ে থাকে রঙিন কাগজ, নাম লেখা থাকে আদরের—কখনও ‘চাঁদমণি’, কখনও ‘রাজহংস’, কখনও বা ‘সোনাঝুরি’। হাতে লাটাই, আঙুলে মাঞ্জা দেওয়া সুতো—আর চোখে এক অনির্বচনীয় আনন্দ। ‘ভৌ কাট্টা’ ধ্বনিতে কেঁপে ওঠে পাড়া, ছাদ থেকে ছাদে ছুটে বেড়ায় হাসি আর উল্লাস।

এই ঘুড়ি ওড়ানো যেন শুধু খেলা নয়। মানুষ যেন আকাশের দিকে পাঠায় নিজের না-বলা কথাগুলো। রঙিন কাগজের শরীরে ভর করে উড়ে যায় সুখ-দুঃখ, আশা-প্রার্থনা, অনুচ্চারিত আকাঙ্ক্ষা। কেউ পাঠায় সংসারের শান্তির কামনা, কেউ বা জীবনের মোড় ঘোরানোর অনুরোধ। ঘুড়ির সুতো ধরে মানুষ কথা বলে সেই গভীর গগনের সঙ্গে—যেখানে নীল আকাশের আড়ালে লুকিয়ে আছেন অদৃশ্য এক প্রভু।

বর্ধমান শহরের এই ঘুড়ি উৎসবের সঙ্গে মিশে আছে রাজবাড়ির স্মৃতি, ইতিহাসের সুবাস। প্রায় চারশো বছর ধরে এই আকাশযাত্রার রেওয়াজ চলে আসছে। কথিত আছে, বর্ধমানের মহারাজ প্রতাপচন্দ্র একদিন তাঁর প্রিয়াকে খুশি করতে পৌষ সংক্রান্তির সকালে আকাশে ঘুড়ি ওড়ান। সেই মুহূর্তেই শুরু হয় এক ঐতিহ্য—যা রাজপ্রাসাদ পেরিয়ে পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের ছাদে।

মহারাজা মহাতাব চাঁদের আমলে পৌষ সংক্রান্তি হয়ে উঠত রাজকীয় উৎসব। রাজবাড়ির অন্দরে তখন ব্যস্ততা—রাজহেঁসেলে খেজুরগুড়ের পিঠে, পাটিসাপটা, দুধের পুলি। দেশ-বিদেশ থেকে আসা অতিথিদের আপ্যায়ন শেষে মহারাজ তাঁদের নিয়ে যেতেন ঘুড়ি মেলায়। বিদেশ থেকে আনা হতো বিচিত্র ঘুড়ি। দূরদূরান্ত থেকে প্রজারা গরুর গাড়িতে চড়ে আসতেন। মেলায় বিক্রি হতো মাটির হাঁড়ি, কলসি। সন্ধ্যা নামলেই শুরু হতো টুসু গানের আসর—রাঢ় বাংলার লোকসংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ত অতিথিদের বিস্মিত চোখে।

See also  আউসগ্রামের মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বিহার থেকে গ্রেপ্তার ২

সময় বদলেছে, রাজপ্রাসাদের দরবার নিস্তব্ধ হয়েছে। তবু ঐতিহ্যের সুতো ছেঁড়েনি। রাজপরিবারের সদস্যরা যতদিন ছিলেন, ততদিন ধরে রেখেছিলেন এই উৎসবকে। মহারাজা বিজয় চাঁদের ভগিনেয় শংকর দাস খান্না ঘুড়ি ওড়ানোর নেশায় মগ্ন থাকতেন সারা বছর। একবার তিনি রাজকার্যে শহরের বাইরে থাকায় সংক্রান্তির ঘুড়ি উৎসবে যোগ দিতে পারেননি। প্রিয় ভগিনেয়ের আক্ষেপ দেখে মহারাজ বিজয় চাঁদ সংক্রান্তির পরের দিন, ২রা মাঘ, সর্বমঙ্গলা পাড়ায় ঘুড়ি মেলার সূচনা করেন—যেন উৎসব কোনও দিন থেমে না যায়।

আজ রাজা নেই, রাজ্য নেই। কিন্তু উৎসব আছে। বাঁউড়ির দিন থেকেই বর্ধমান শহরের আকাশ রঙিন হয়ে ওঠে। সংক্রান্তির সকালে দামোদরের ধারে সদর ঘাটে বসে ঘুড়ি মেলা। শীতের রোদ গায়ে মেখে আট থেকে আশি—সবাই যেন সমান বয়সী। হাতে লাটাই, চোখে আকাশ।
বর্ধমানের ঘুড়ি উৎসব তাই কেবল একটি দিন নয়—এ এক উত্তরাধিকার। আকাশে উড়তে থাকা প্রতিটি ঘুড়ির সঙ্গে বয়ে চলে শহরের স্মৃতি, মানুষের আবেগ, ইতিহাসের নিঃশব্দ সাক্ষ্য। যতদিন বর্ধমান থাকবে, ততদিন আকাশে উড়বে ঘুড়ি—আর সুতোর টানে বেঁধে রাখবে শহরের হৃদয়।

krishna Saha

আমার নাম কৃষ্ণ কুমার সাহা, আমি ফুল টাইম সাংবাদিকতা করি।গত ৮ বছর ধরে এই পেশায় আছি