আবহাওয়া দক্ষিণবঙ্গ শিক্ষা লাইফ স্টাইল স্বাস্থ্য ভ্রমন ধর্ম কৃষি কাজ ক্রাইম

চুলের সৌন্দর্য বনাম হেলমেট — গুসকরায় শিক্ষকের ‘উবাচ’, চা-দোকানদারের গোলাপে সচেতনতার পাঠ; নববর্ষে এক ব্যতিক্রমী সামাজিক বার্তা

krishna Saha

Published :

WhatsApp Channel Join Now

উত্তম কুমার না অমিতাভ বচ্চন—কার চুল বেশি সুন্দর? এমনই রসিকতায় মোড়া এক ব্যতিক্রমী ও চিন্তাজাগানিয়া মুহূর্তের সাক্ষী থাকল পূর্ব বর্ধমানের গুসকরা বাসস্ট্যান্ড। নতুন ইংরেজি বছরের প্রথম দিন, বৃহস্পতিবার। নববর্ষের সকালে ট্রাফিক আইন মানার পাঠ দিতে পুলিশের লাঠি বা জরিমানার বদলে হাতে লাল টুকটুকে গোলাপ নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন স্থানীয় চা-দোকানদার পাঞ্জাব সেখ।

শীতের দুপুরে এই অভিনব উদ্যোগে সাড়া ছিল চোখে পড়ার মতো। হেলমেট পরা হোক বা না-পরা—প্রায় সব বাইক আরোহীই গাড়ি থামিয়ে হাসিমুখে পাঞ্জাবের হাত থেকে গোলাপ গ্রহণ করছিলেন। কোথাও ছিল না কোনও কড়াকড়ি, ছিল না শাসন—ছিল শুধু মানবিক অনুরোধ আর সচেতনতার বার্তা। যেন বলেই উঠছিল, “हम हैं सीधे साधे, पर बात दिल की कहते हैं”—সরল ভাবেই বলা হচ্ছে জীবনের কথা।

কিন্তু এই ছবির মধ্যেই এক জায়গায় খানিকটা নাটকীয় মোড় নেয় ঘটনা। গুসকরা পি.পি. ইনস্টিটিউশনের বাংলা শিক্ষক সানওয়ার হোসেনের হাতে যখন গোলাপ তুলে দেওয়া হয়, তখনই শুরু হয় রীতিমতো প্রশ্নোত্তরের পর্ব।

প্রশ্ন ওঠে—হেলমেট পরেননি কেন? উত্তরে প্রথমে রসিকতার সুরেই শিক্ষক সানওয়ার হোসেন বলেন,
“আজ আমি শ্রী আশিসবাবুর কাছ থেকে একটি সুন্দর গোলাপ উপহার পেয়েছি। আমার ছাত্রছাত্রী, কবি, লেখক ও সাংবাদিকরাও আমাকে গোলাপ দিয়েছেন”। তবে আসল কারণ জানতে চাওয়ায় তিনি সোজাসাপ্টা জানান, “হেলমেট পরলে মাথার চুলের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে। বার্গান্ডি রঙের চুলের জেল্লা হারিয়ে ফেলব বলেই আজ হেলমেট পরিনি”। রসিকতা আরও বাড়িয়ে যোগ করেন, “আমার বাবা আমাকে বেধড়ক মারলেও চুল কাটাতে পারেননি”। যদিও এখানেই থামেননি তিনি। পরে সংযোজন করেন, “দূরপাল্লার রাস্তায় গেলে আমি অবশ্যই হেলমেট পরি। আজ লোকাল রাস্তা বলেই পরিনি”।

কিন্তু তখনই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—একজন শিক্ষক হিসেবে আপনার কাছ থেকে ছাত্রছাত্রীরা কী শিখবে? এই প্রশ্নে সানওয়ার হোসেনের জবাব, “আমার ছাত্রদের বয়স ১৮–২০ বছর। ওরা ঘণ্টায় ৭০–৮০ কিলোমিটার গতিতে বাইক চালায়। আর আমি ৫৭ বছরের মানুষ—ঘণ্টায় মাত্র ১৮–২০ কিলোমিটার গতিতে চালাই, প্রায় সাইকেলের থেকেও ধীরে”। তবুও দুর্ঘটনার আশঙ্কা তো থেকেই যায়—এই যুক্তিতে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, হতে পারে। যদি অন্য কেউ এসে ধাক্কা মারে”। আইন ভাঙার প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট, “আমি আইন ভাঙছি না। আমার হেলমেট বাইকের পেছনেই রাখা আছে। চাইলে বের করে দেখাতে পারি”।

See also  উত্তরাখণ্ডে মেঘভাঙা বৃষ্টি ও হড়পা বানে মৃত্যু ৪ জনের, নিখোঁজ অন্তত ৫০

এই কথোপকথন ঘিরে রাস্তায় চলাচলকারী বাইক আরোহী থেকে শুরু করে পথচারীরাও দাঁড়িয়ে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যেই গুসকরা বাসস্ট্যান্ড যেন পরিণত হয় এক খোলা মঞ্চে—যেখানে শোনা যায় শিক্ষকের রসিক ‘উবাচ’ আর জীবনের নানা যুক্তি.

উল্লেখযোগ্যভাবে, গুসকরা বাসস্ট্যান্ডের ছোট্ট চায়ের দোকানের মালিক পাঞ্জাব সেখ কেবল চা বিক্রেতাই নন। সারা বছর ধরেই তিনি যুক্ত থাকেন নানা সামাজিক কাজে—কখনও শীতবস্ত্র বিতরণ, কখনও পুজোয় দরিদ্রদের হাতে নতুন জামাকাপড় তুলে দেওয়া। আর বছরের প্রথম দিনে, গোলাপ হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হেলমেট না-পরা বাইক আরোহীদের সচেতনতার পাঠ দিলেন একান্ত নিজের ভঙ্গিতে।

নববর্ষের দিনে গুসকরায় তাই চুলের সৌন্দর্য বনাম হেলমেট—এই রসিক বিতর্কের আড়ালেই উঠে এল এক গভীর সামাজিক বার্তা। শাসন নয়, সংলাপই যে সচেতনতার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার—এই ছবিই যেন নতুন বছরের প্রথম দিনে গুসকরা বাসস্ট্যান্ড থেকে ছড়িয়ে পড়ল।

krishna Saha

আমার নাম কৃষ্ণ কুমার সাহা, আমি ফুল টাইম সাংবাদিকতা করি।গত ৮ বছর ধরে এই পেশায় আছি