রাজ্যে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলেও স্কুলছুট সমস্যাটি এখনও সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে কিছু সংখ্যক পড়ুয়া মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। শিক্ষাবিদদের মতে, প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি শিক্ষকদের আন্তরিকতা, স্নেহ ও ব্যক্তিগত উদ্যোগই এই সমস্যা সমাধানে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।
শিক্ষা দপ্তরের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, আর্থিক সঙ্কট, পারিবারিক দায়িত্ব, অল্পবয়সে শ্রমে যুক্ত হওয়া, অল্পবয়সে বিয়ে, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার ভয় কিংবা মানসিক চাপ—এই সব কারণেই পড়ুয়ারা বিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। বিশেষত গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে এই প্রবণতা তুলনামূলক বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিভিন্ন জেলার একাধিক বিদ্যালয়ে ইতিমধ্যেই শিক্ষক-শিক্ষিকারা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে পড়ুয়াদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পড়ুয়ার অনুপস্থিতির প্রকৃত কারণ বোঝার চেষ্টা করলে এবং অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করলে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
শিক্ষকদের মতে, অনেক ছাত্রছাত্রী পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার কারণে লজ্জা বা ভয়ের বশে স্কুলে আসা বন্ধ করে দেয়। তাঁদের আলাদা করে সহায়ক ক্লাস, পুনরাবৃত্তি পাঠ এবং মানসিক সাহস জোগালে তারা আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারে।
রাজ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু রয়েছে। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক, ইউনিফর্ম, মধ্যাহ্নভোজ, কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী প্রভৃতি প্রকল্প ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পগুলির সুবিধা যাতে প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছয় এবং কোনও পড়ুয়া যাতে সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে বিদ্যালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিংয়ের গুরুত্ব: বর্তমান সময়ে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক চাপও একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পড়াশোনার প্রতিযোগিতা, পারিবারিক অশান্তি বা সামাজিক চাপ অনেক সময় ছাত্রছাত্রীদের হতাশ করে তোলে।মনোবিদদের মতে, বিদ্যালয়ে নিয়মিত কাউন্সেলিং সেশন, ‘বন্ধু ক্লাব’ বা মেন্টরিং ব্যবস্থা চালু থাকলে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের সমস্যা খোলাখুলি জানাতে পারে। একজন শিক্ষক যদি অভিভাবকের মতো পাশে দাঁড়ান, তবে ছাত্রছাত্রীদের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই ফিরে আসে।
স্কুলছুট রোধে শুধু শিক্ষক বা সরকার নয়, অভিভাবক ও স্থানীয় সমাজেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। শিশু শ্রম বা অল্পবয়সে বিবাহের মতো সামাজিক সমস্যাগুলি অনেক সময় পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সচেতনতা বৃদ্ধি ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে এই প্রবণতা কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্থানীয় পঞ্চায়েত, বিদ্যালয় পরিচালন সমিতি এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির সমন্বিত উদ্যোগে বহু জায়গায় ইতিবাচক ফল মিলেছে। নিয়মিত নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা পড়ুয়াদের চিহ্নিত করা গেলে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শুধুমাত্র পরিসংখ্যানের উন্নতি নয়, প্রতিটি শিশুর বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
‘জিরো ড্রপআউট’ লক্ষ্য পূরণ করতে হলে শিক্ষকদের মানবিক ভূমিকা, প্রশাসনিক সহায়তা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা—এই তিনের সমন্বয় অপরিহার্য।সব মিলিয়ে বলা যায়, একটি শিশুকে বিদ্যালয়ে ফেরানো শুধু একটি পরিসংখ্যানগত সাফল্য নয়, বরং তার ভবিষ্যৎ গঠনের পথে নতুন দরজা খুলে দেওয়া। আর সেই পথচলায় শিক্ষকদের স্নেহ, আন্তরিক চেষ্টা ও নিয়মিত যোগাযোগই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি।







