এক সময় বিকেল নামলেই আকাশজুড়ে বসত রঙিন ঘুড়ির মেলা। পেটকাটি, চাঁদিয়াল, গেলাসি, প্রজ্ঞা—নানা নামের ঘুড়িতে ভরে উঠত আকাশ। মাঠ, ছাদ কিংবা ফাঁকা জমিতে জমে উঠত ঘুড়ি কাটার লড়াই। লাটাই হাতে ছুটে বেড়ানো, প্যাঁচ খেলায় মেতে ওঠা আর ঘুড়ি কাটতেই উচ্ছ্বাসে চিৎকার—“ভোকাট্টা”! সেই দৃশ্য আজ আর চোখে পড়ে না বললেই চলে। স্মৃতির পাতায় ধীরে ধীরে বন্দি হয়ে যাচ্ছে এক সময়ের চেনা আনন্দ।

বর্তমান প্রজন্মের কাছে ঘুড়ি ওড়ানোর যেন আর সময় নেই। মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম ও ডিজিটাল বিনোদনের নেশায় আকাশের দিকে তাকানোর অবকাশটুকুও হারিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় বিশ্বকর্মা পুজো বা উৎসবের মরশুমে ঘুড়ির দোকান সাজানো থাকলেও ক্রেতার ভিড় নেই। লাটাই ও সুতোর প্যাকেজ মিললেও নতুন প্রজন্মের আগ্রহ তাতে নেই বললেই চলে। ফলস্বরূপ, দোকানের তাকেই পড়ে থাকছে রঙিন ঘুড়ির ঝাঁক, হতাশ মুখে দিন কাটাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
দক্ষিণ দামোদর এলাকার,সেহারা বাজারের এক ঘুড়ি ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, “দু’বছর আগেও ঘুড়ির ভালো বিক্রি ছিল। এ বছর সেই তুলনায় ১০ শতাংশও বিক্রি হয়নি। সবাই এখন মোবাইলে ডুবে।” তাঁর কথায়, শিশু-কিশোরেরা ঘরের মধ্যেই বন্দি থাকছে। খেলাধুলোর অভাবে যেমন শরীরচর্চা কমছে, তেমনই প্রভাব পড়ছে মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও।
আট ও নয়ের দশক পর্যন্ত ঘুড়ি ওড়ানো ছিল শৈশবের অন্যতম আনন্দ। বিকেল হলেই মাঠ কিংবা ফাঁকা জায়গায় ছুটে যেত ছোটরা। কেউ নিজের হাতে সুতোয় মাঞ্জা দিতেন—কাচ গুঁড়ো করে, সাবু জ্বাল বা ভাতের ফ্যান মিশিয়ে। তারপর লাটাইয়ের সুতো ছেড়ে শুরু হতো প্যাঁচ খেলা। দূরের আকাশে ভেসে থাকা অন্য ঘুড়ির সঙ্গে লড়াই, আর কাটতে পারলেই চারদিক কাঁপিয়ে ওঠা উল্লাস—সেইসব মুহূর্ত আজ শুধুই স্মৃতি।
তবে ঘুড়ির আনন্দ কমে যাওয়ার পেছনে শুধু সময়ের অভাব বা মোবাইলের নেশাই নয়, বড় কারণ হয়ে উঠেছে বিপজ্জনক কাচ-প্রলিপ্ত মাঞ্জা বা ধাতব সুতো। এই সুতোয় গলা কাটা, গুরুতর জখম এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে। ফলে ঘুড়ি ওড়ানো নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি বেড়েছে। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে অনেক জায়গায় প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞাও জারি হয়েছে, যা ঘুড়ির চল কমার অন্যতম কারণ।
তবু সবকিছুর মাঝেও কিছু মানুষ এখনও ঘুড়িকে আঁকড়ে ধরে আছেন। তাঁদের কাছে ঘুড়ি ওড়ানো নিছক খেলা নয়—এ এক সংস্কৃতি, এক সময়ের সামাজিক মিলন ও শৈশবের স্মৃতির প্রতীক। প্রশ্ন একটাই—মোবাইলের পর্দা আর আধুনিকতার ভিড়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি আর কখনও ফিরিয়ে আনবে রঙিন আকাশের সেই চেনা আনন্দ, নাকি ঘুড়ি থেকে যাবে শুধু স্মৃতির আকাশেই?












