কৃষ্ণ সাহা, রায়না, পূর্ব বর্ধমান: অন্যান্য দিনের থেকে একেবারেই আলাদা আজকের দিন। গ্রামের প্রতিটি গৃহস্থের বাড়িতে বন্ধ থাকে চুলো। কিন্তু তাতে থেমে থাকে না রান্না—বরং সমগ্র গ্রাম জুড়েই শুরু হয় এক বিশাল রান্নার আয়োজন। দল বেঁধে মাঠে মাঠে হাঁড়ি বসে, আত্মীয়-স্বজনের আগমনে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। এমনই এক অনন্য লোকাচার চলে আসছে পূর্ব বর্ধমানের রায়না-১ ব্লকের সেহারা অঞ্চলের বেঁন্দুয়া গ্রামে।
প্রত্যেক বছর বসন্ত পঞ্চমীর পর যে মঙ্গলবার আসে, সেই দিনটিতেই এই বিশেষ উৎসব পালন করা হয়। কেউ বলেন এটি মা মনসার পুজো, আবার কারও মতে এটি ব্রহ্মার পুজোর সঙ্গে জড়িত। নাম বা ব্যাখ্যা যাই হোক না কেন, গ্রামবাসীদের কাছে এই দিনটি মিলন, আনন্দ আর ঐতিহ্যের প্রতীক।
এদিন পুরো গ্রাম যেন এক বিশাল পিকনিক স্পটে পরিণত হয়। বাড়ির বাইরে, খোলা মাঠে একসঙ্গে রান্না, খাওয়া-দাওয়া—দিন থেকে রাত পর্যন্ত চলে উৎসবের আমেজ। দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়রা আসেন, বহুদিন পর দেখা হয় আপনজনদের। হাসি, গল্প আর ব্যস্ততার মধ্যেই কেটে যায় গোটা দিন।
গ্রামের গৃহবধূরা আবেগভরে জানান, “বাপের বাড়িতে এই রকম উৎসব দেখিনি। বিয়ের পর এখানে এসে প্রথম দেখলাম। খুব ভালো লাগে—একটা দিন সবাই বাড়ির বাইরে, একসঙ্গে রান্না, একসঙ্গে খাওয়া। মনে হয় পুরো গ্রামটাই একটা পরিবার।”
রীতিমতো নিয়ম মেনেই হয় রান্না। প্রায় সব বাড়িতেই থাকে মাছের পদ, সঙ্গে নানা রকম তরকারি ও কুলের ডাল। প্রথমে সেই রান্না অর্পণ করা হয় ঠাকুরের উদ্দেশ্যে, তারপর প্রসাদরূপে সবাই একসঙ্গে খেয়ে নেন।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই প্রথা আজও অটুট। আধুনিকতার ভিড়েও বেঁন্দুয়া গ্রাম ধরে রেখেছে তাদের শিকড়, তাদের সংস্কৃতি। বসন্তের এই মঙ্গলবার তাই শুধু একটি পুজোর দিন নয়—এ দিন আসলে গ্রামবাংলার ঐক্য, ভালোবাসা আর মিলেমিশে থাকার এক জীবন্ত উদাহরণ।








