একসময় গ্রামের আকাশ মানেই ছিল সবুজ ধানক্ষেত, তালগাছের মাথায় হেলে থাকা বাতাস আর সেই বাতাসে দুলতে থাকা উল্টো কুঁজোর মতো ঝুলে থাকা বাবুই পাখির বাসা। সন্ধ্যা নামলে মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে থাকলেই দেখা মিলত ছোট ছোট হলুদ-বাদামি পাখিদের ব্যস্ত আনাগোনা—খড়কুটো, ঘাসের আঁশ, নরম তন্তু ঠোঁটে করে এনে তারা গড়ে তুলত তাদের আশ্চর্য স্থাপত্য।
আজ আর তেমন দেখা মেলে না বাবুইয়ের।
গ্রামের বুড়োরা বলেন, “এই যে তালগাছটার মাথায় একসময় কত বাসা ছিল! বর্ষার হাওয়ায় দুলত, তবু ছিঁড়ত না”। সত্যিই তো—বাবুই পাখির বাসা যেন প্রকৃতির এক বিস্ময়। উল্টো করে ঝোলানো, নিচের দিকে সরু সুড়ঙ্গের মতো প্রবেশপথ, ভেতরে আরামদায়ক কক্ষ—ঝড়বৃষ্টিতেও টিকে থাকার মতো নিখুঁত নির্মাণ। যেন ছোট্ট এক শিল্পীর হাতে গড়া স্বপ্নের বাড়ি।
কিন্তু সেই স্বপ্নের বাড়িগুলো আজ অচিরেই হারিয়ে যাচ্ছে।
কেন? হয়তো তাল-খেজুর গাছ কমে গেছে। হয়তো খোলা মাঠের জায়গা নিয়েছে কংক্রিটের বাড়ি। হয়তো কীটনাশকের প্রভাবে কমে গেছে তাদের খাবার। এখন আর সন্ধ্যাবেলা মাথার উপর ঝুলে থাকা বাসাগুলো দেখে শিশুদের কৌতূহলী প্রশ্ন শোনা যায় না—“এগুলো কে বানিয়েছে”? এখন আর স্কুলপথে হাঁটতে হাঁটতে কেউ থমকে দাঁড়িয়ে বলে না, “দেখো দেখো, বাবুই পাখি”!
একদিন গ্রামের এক কিশোর তার দাদুকে জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবুই পাখি কি গল্পের পাখি”?
দাদু হেসে বলেছিলেন, “না রে, ওরা ছিল। আমাদের চোখের সামনেই ছিল”। ‘ছিল’—এই শব্দটাই যেন আজ কাঁটার মতো বিঁধে থাকে। প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের দূরত্ব যত বেড়েছে, ততই দূরে সরে গেছে বাবুই। তারা অভিমান করেছে কি না জানা নেই, তবে তাদের অনুপস্থিতি গ্রামবাংলার আকাশকে খানিকটা ফাঁকা করে দিয়েছে। তালগাছের ডগায় আর দোলে না উল্টো কুঁজোর বাসা, হাওয়ায় আর বাজে না তাদের ডানার সুর।
তবু আশা কি একেবারে শেষ? যদি আবার গাছ বাড়ে, যদি মাঠ টিকে থাকে, যদি মানুষ একটু জায়গা ছেড়ে দেয় প্রকৃতিকে—হয়তো একদিন আবার দেখা মিলবে। হয়তো কোনও এক বর্ষার বিকেলে, তালগাছের মাথায় আবার দুলবে ছোট্ট এক উল্টো কুঁজোর ঘর। আর কেউ একজন আঙুল তুলে বলবে— “ওই দেখো, বাবুই ফিরে এসেছে”।







