সমাজ যত আধুনিক হচ্ছে, প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই যেন কোথাও মানবিকতার ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই সংবাদ শিরোনামে উঠে আসছে পশু নির্যাতনের ঘটনা— কখনও পথকুকুরকে মারধর, কখনও বিষপ্রয়োগ, কখনও বা অবহেলায় মৃত্যুর খবর। এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে— মানব জীবনে কি সত্যিই পশুপ্রেম জাগ্রত হচ্ছে, নাকি আমরা ক্রমশ সংবেদনহীন হয়ে পড়ছি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যে সমাজ দুর্বল ও অবলা প্রাণীর প্রতি সহমর্মী নয়, সেই সমাজ কখনও সম্পূর্ণ সভ্য হতে পারে না। পশুপ্রেম কেবল আবেগ নয়, এটি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শহরাঞ্চলে প্রতিদিন অসংখ্য পথকুকুর ও বিড়াল খাদ্য ও আশ্রয়ের অভাবে ঘুরে বেড়ায়। গরমে পানীয় জলের অভাব, বর্ষায় আশ্রয় সংকট— তাদের জীবন প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তায় ভরা। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলেও গবাদি পশুর প্রতি অবহেলা বা অমানবিক আচরণের অভিযোগ মাঝেমধ্যেই সামনে আসে।
প্রাণীপ্রেমী সংগঠনগুলির দাবি, মানুষ সচেতন হলে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলাতে পারে। বাড়ির বাড়তি খাবার নষ্ট না করে পথপ্রাণীদের দেওয়া, গরমকালে বাড়ির সামনে জল রাখা, অসুস্থ প্রাণী দেখলে পশু চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ— এই ছোট ছোট পদক্ষেপই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
পরিবেশবিদদের মতে, পশুপ্রেম মানে শুধু প্রাণীকে আদর করা নয়, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা। বনভূমি ধ্বংস, জলাশয় ভরাট ও দূষণের ফলে অসংখ্য বন্যপ্রাণী বাসস্থান হারাচ্ছে। ফলে তারা লোকালয়ে চলে আসছে, তৈরি হচ্ছে মানুষ-প্রাণী সংঘাত।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, সহাবস্থানই একমাত্র সমাধান। মানুষকে বুঝতে হবে— পৃথিবী কেবল মানুষের একার নয়। প্রতিটি প্রাণীর বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ছোটবেলা থেকে শিশুদের প্রাণীর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখানো জরুরি। একটি শিশু যখন শেখে যে পশুরাও ব্যথা পায়, অনুভব করে— তখন তার মানসিক বিকাশ আরও সুস্থ হয়। স্কুল ও পরিবারে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
পশু নির্যাতন রোধে দেশে আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রাণী কল্যাণ সংস্থাগুলির দাবি, অভিযোগ জানাতে অনেকেই ভয় পান বা গুরুত্ব দেন না। ফলে বহু ঘটনা অজানাই থেকে যায়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ইতিমধ্যেই কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পথপ্রাণীদের টিকাকরণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কাজ করছে। অনেক আবাসনে বাসিন্দারা মিলে নিয়মিত খাবার ও জল দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এই উদ্যোগগুলিই দেখিয়ে দিচ্ছে— ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়।
একটি সমাজকে বিচার করা যায় তারা দুর্বলদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তা দিয়ে। পশুরা নিজেদের কথা বলতে পারে না, তাই তাদের হয়ে কথা বলার দায়িত্ব মানুষেরই।
মানব জীবনে পশুপ্রেম জাগ্রত হওয়া মানে কেবল দয়া নয়— এটি উন্নত মানসিকতার পরিচয়। সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও সহাবস্থানের বার্তাই পারে সমাজকে আরও সুন্দর ও নিরাপদ করে তুলতে।
আজকের প্রশ্ন একটাই— আমরা কি সত্যিই মানুষ হয়ে উঠছি? সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। মানবিক হোক মন, জাগুক পশুপ্রেম।







