পূর্ব বর্ধমান জেলার,কালনার সরস্বতী পুজো মানেই অভিনব ভাবনা ও শৈল্পিক উপস্থাপনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রতি বছরই থিমের বৈচিত্র্যে দর্শকদের চমকে দেয় এখানকার পুজো কমিটিগুলি। আর এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। আর মাত্র একদিন বাকি সরস্বতী পুজোর, তার আগেই প্রস্তুতিতে তুঙ্গে কালনার প্রতিটি পুজো কমিটি। একে অপরকে থিমে টেক্কা দিতে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা এখন সর্বত্রই চোখে পড়ছে।
এই আবহেই কালনার বকুলতলা এলাকার রুপালিকা ক্লাব এবছর তাদের সরস্বতী পুজোয় তুলে ধরেছে এক ব্যতিক্রমী ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ থিম— ‘কাঁটাতার’। বর্তমান সময়ে সমাজজুড়ে চলা বিভ্রান্তি, উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তার আবহ থেকেই এই ভাবনার জন্ম বলে মনে করছেন অনেকে।
রুপালিকা ক্লাবের মণ্ডপে মূলত ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ১৯৭১ সালে কাঁটাতার পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া উদ্বাস্তু মানুষদের করুণ জীবনসংগ্রাম।
একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচারের ফলে কীভাবে অসংখ্য মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে সীমান্ত পেরোতে বাধ্য হয়েছিলেন— সেই সময়ের জীবনযাত্রা, মানসিক টানাপোড়েন, খাদ্যাভ্যাস ও প্রতিদিনের লড়াইকে অত্যন্ত বাস্তবধর্মীভাবে মণ্ডপে তুলে ধরেছেন শিল্পী। কাঁটাতারের বেড়া, উদ্বাস্তু মানুষের ক্লান্ত ও আতঙ্কিত মুখ, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়— সব মিলিয়ে গোটা মণ্ডপজুড়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর অনুভব ও নীরব প্রশ্নের আবহ।
শিল্পীর কথায়, “বর্তমান সময়টাও অনেকটা সেই রকম পরিস্থিতির দিকেই এগোচ্ছে বলে মনে হয়। মানুষ কীভাবে কাঁটাতারের বেড়ায় আটকে পড়ে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালায়, সেটাই আমরা শিল্পের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছি”। পুজো উদ্যোক্তাদের তরফে এক উদ্যোক্তা জানান, প্রায় দেড় মাস ধরে শিল্পী অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “শিল্পী যখন প্রথম এই থিমের কথা আমাদের জানান, তখনই বিষয়টি আমাদের খুব ভালো লাগে। ধাপে ধাপে যেভাবে তিনি পুরো ভাবনাটিকে মণ্ডপে রূপ দিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে”।
তবে উদ্যোক্তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, এই থিমের সঙ্গে তাঁরা কোনওভাবেই SIR বা NRC-কে সরাসরি যুক্ত করতে চান না। তাঁদের মতে, দর্শক যেভাবেই এই থিমকে ব্যাখ্যা করুন না কেন, মূল উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালে কাঁটাতার পেরিয়ে আসা উদ্বাস্তু মানুষদের যন্ত্রণা ও ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা।
এদিকে, রুপালিকা ক্লাবের এই সাহসী ও সময়োপযোগী ভাবনাকে অনেক দর্শকই বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন। অনেকের মতে, ভবিষ্যতে যদি NRC-এর মতো কোনও পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কীভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে— সেই আশঙ্কার সঙ্গেও এই থিমের মিল খুঁজে পাচ্ছেন তাঁরা।
সব মিলিয়ে, কালনার সরস্বতী পুজোর মণ্ডপে রুপালিকা ক্লাবের ‘কাঁটাতার’ থিম শুধুমাত্র একটি শৈল্পিক উপস্থাপনা নয়, বরং দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করা এক শক্তিশালী সামাজিক বার্তা— এমনটাই মনে করছে পুজো দেখতে আসা মানুষের বড় অংশ।








