বালুরঘাট | ১লা মার্চ, ২০২৬: দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট শহরের অদূরে ডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের হোসেনপুরের কাছে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী চকবাখর গ্রামে এবারও মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে চঞ্চলা কালী মায়ের পুজো ও তিনদিনব্যাপী বিশাল মেলা। দোলপূর্ণিমার পরের দিন অর্থাৎ ৪ঠা মার্চ, বুধবার গভীর রাতে শুরু হবে এই ঐতিহ্যবাহী পুজো। পাশাপাশি ৪ঠা মার্চ থেকে ৬ই মার্চ পর্যন্ত চলবে ভক্তি, আনন্দ ও লোকসংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল এই মেলা।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এই পুজো ও মেলা শুধুমাত্র ভক্তি ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি এলাকার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
চঞ্চলা কালী মায়ের পুজোর ইতিহাস তিনশো বছরের পুরনো। জনশ্রুতি অনুসারে, মাহিনগরের মহি রাজা প্রায় তিনশো বছর আগে এই পুজোর সূচনা করেন। মাহিনগর থেকে একটি সুরঙ্গপথ দিয়ে চকবাখরে এসে তিনি এই মন্দির নির্মাণ করেন। তবে তাঁর মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন এই পুজো বন্ধ ছিল। পরবর্তীতে স্থানীয় এলাকার মায়ের জনৈক ভক্ত স্বপ্নাদেশ পেয়ে পুজোর পুনঃপ্রবর্তন করেন।
চঞ্চলা কালী মায়ের মূর্তি অন্যান্য কালীর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাধারণত কালীর পায়ের নীচে শিবের অবস্থান দেখা যায়, কিন্তু চঞ্চলা কালীর পায়ের নীচে রয়েছে অসুর ও সিংহ। আট হাতে সজ্জিত এই দেবী মহামায়া ও চামুণ্ডার এক রূপ হিসেবে পূজিত হন।
চঞ্চলা কালী মায়ের পুজো ভক্তদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পুজোর পাঁচ দিন আগে মন্দিরে ঘট স্থাপন করা হয়। পাঁঠা, পায়রা এবং চুল বলির প্রথা এখানকার পুজোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বলির জন্য ব্যবহৃত কাঠের কাতরা মন্দির সংলগ্ন পুকুরে ডুবিয়ে রাখা হয় এবং পুজোর দিন তা তুলে আনা হয়। তবে এই বলি শুধুমাত্র পুজো কমিটির পক্ষ থেকেই দেওয়া হয়।
মন্দিরের পাশেই শ্মশান কালী ও মাশান কালীর মন্দির অবস্থিত। চঞ্চলা কালী মায়ের পুজোর পরদিন তাঁদের তন্ত্রমতে পূজা করা হয়। মন্দিরের সামনে অবস্থিত নাটমন্দিরে পুজোর পরে দুদিন ধরে মঙ্গলচণ্ডীর গান পরিবেশিত হয়।
মন্দির সংলগ্ন পুকুরটি এই পুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। একসময় শোনা যেত, এই পুকুর থেকে পুজোর থালা-বাসন ভেসে উঠত। বর্তমানে এই পুকুরের জল দিয়েই মায়ের পুজো সম্পন্ন করা হয়।
পুজোর পাশাপাশি তিনদিনব্যাপী এই মেলা ভক্তি, আনন্দ ও লোকসংস্কৃতির এক অনন্য উৎসব। মেলার অন্যতম আকর্ষণ হল ভক্তদের লোক ক্রীড়া। কাঠের পাটাতনে পুঁতে রাখা পেরেক ও খর্গের উপর শিব-কালী সেজে ভক্তরা নৃত্য পরিবেশন করেন। লোকবাদ্যের সুরে মুখা নাচ এবং অস্ত্র নিয়ে খেলার রীতি এখানকার সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
চঞ্চলা কালী মাতার ভক্তরা একত্রিত হয়ে এই নাচ ও খেলা পরিবেশন করেন। মেলার বিভিন্ন দোকানপাট, লোকসংস্কৃতির প্রদর্শনী এবং বিভিন্ন রকমের ক্রীড়া-উৎসব এই মেলার আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
জমিদার বাড়ির বর্তমান প্রজন্মের বংশধর এবং পূজা কমিটির সভাপতি সুপ্রিয় কুমার চৌধুরী বলেন, “চঞ্চলা কালী মায়ের পুজো আমাদের এলাকার ঐতিহ্যের প্রতীক। এটি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং লোকসংস্কৃতির এক অনন্য উদাহরণ। আমরা চাই, এই পুজোকে আরও বড় আকারে তুলে ধরতে এবং মন্দিরকে একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে।”
এবছর দোলপূর্ণিমার পরের দিন অর্থাৎ ৪ঠা মার্চ, বুধবার গভীর রাতে শুরু হবে চঞ্চলা কালী মায়ের বার্ষিক পুজো। ৪ঠা মার্চ থেকে ৬ই মার্চ পর্যন্ত চলবে তিনদিনব্যাপী মেলা। ভক্তি, সংস্কৃতি এবং আনন্দের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটবে এই তিনদিনের উৎসবে।
চঞ্চলা কালী মায়ের পুজো শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।








