প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান ১ এপ্রিল: চাকরি জীবনে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মেনে ভোটার তালিকায় নতুন নাম তোলা থেকে শুরুকরে শুনানি,সবই করেছেন।এমনকি বিধানসভা ও লোকসভা ভোট পরিচালনার দায়িত্বও দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন। তবু আজ নিজ ভূমের ভোটার তালিকাতেই ব্রাাত্য হয়ে গিয়েছেন বঙ্গের প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মহম্মদ মতিন।

পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর বিধানসভার ৬৫ নম্বর বুথের ভোটার তালিকা থেকে “ডিলিট’ হয়েছে তাঁর নাম। রেহাই পাননি তাঁর স্ত্রী সহ পরিবারের তিন সদস্য এবং নিজের বসত গ্রামের দুই শাতাধীক বাসিন্দা। যদিও আসন্ন বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মহম্মদ মতিনের ছেলে মহম্মদ আসিফ সামলাবেন ’ফাস্ট পোলিং’ অফিসারের দায়িত্ব।তার ট্রেনিংও তিনি ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ করে ফেলেছেন।
জামালপুর বিধানসভার অন্তর্গত জৌগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার এক অখ্যাত গ্রাম ময়না। ৭৫ ঊর্ধ্ব মহম্মদ মতিন এই গ্রামেরই ভূমিপুত্র। তাঁর বাবা মহম্মদ জামাল ছিলেন এই গ্রামেরই প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। সেই স্কুল থেকেই মতিনের শিক্ষা জীবন শুর হয়। মতিনের কথা অনুযায়ী,“১৯৫৯ সালে প্রাথমিক স্কুলের পাঠ সম্পূর্ণ করে তিনি ভর্তি হন জৌগ্রামের গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয়ে।
সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ১৯৬৭ সালে ইংরাজিতে অনার্স নিয়ে তিনি ভর্তি হন হুগলী জেলার ইটাচুনা কলেজে।১৯৭১ সালে তিনি স্নাতক হন।পরবর্তি সময়ে সরকারী চাকরির পরীক্ষা দিয়ে তিনি পাস করেন।১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের কে.জি.ও (১) পদে জলপাইগুড়িতে তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন“।
মতিন জানিয়েছেন,“তিনি জলপাইগুড়িতে কর্ম জীবন শুরু করার কয়েকর বছরের মধ্যেই তাঁর পদোন্নতি হয়। প্রশাসনিক আধিকারিক হিসাবে তিনি জলপাইগুড়ি ছাড়াও বাঁকুড়া মুর্শিদাবাদ সহ বিভিন্ন জেলায় কাজ করেন।এরপর ২০০৩ সালে তিনি ’বিডিও’ পদে উন্নিত হন। প্রথম মুর্শিদাবাদের সুতি ১ নম্বর ব্লকের বিডিও হন।পরে মুর্সিদাবাদের সাগরদিঘী ব্লকের বিডিও হন তিনি। ২০০৮ সালে বদলি হয়ে তিনি হুগলী জেলার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হন।
ওই পদে দু’বছর কাটিয়ে ২০১০ সালের অক্টোবর মসে তিনি অবসর গ্রহন করেন। তারপর ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি তাঁর চাকরির বর্ধিত মেয়াদ কালে এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসাবে বর্ধমান পুরসভার দায়িত্ব সামলান“, চাকরি জীবনের এইসব অধ্যায়ের কথা তুলে ধরে মহম্মদ মতিন দাবি করেন,“তিনি বিডিও হওয়ার পর থেকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে থাকা পর্যন্ত সময়কালে পঞ্চায়েত,বিধানসভা ও লোকসভা ভোটের দায়িত্ব সামলেছেন।
ভোটার তালিকায় নতুন নাম তোলা থেকে শুরুকরে শুনানি,সবই করেছেন।অথচ তিনিই এখন ভোটার তালিকায় ব্রাত্য হয়ে গিয়েছেন।কমিশনের ডাকা শুনানিতে হাজির হয়ে তিনি তাঁর চাকরি জীবনের সরকারী পরিচয়পত্র সহ ২০০২ সালের আগে থেকে ভোটার থাকার তথ্য,পাসপোর্ট, পেনশনের নথি সবই দাখিল করেছিলেন।তবুও কমিশনের প্রকাশ করা অতিরিক্ত (সাপ্লিমেন্টারি)ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ’ডিলিট’ করে দেওয়া হয়েছে।এমন ঘটনায় তিনি অত্যন্ত মর্মাহত এবং অপমানিত বোধ করচেন বলে মহম্মদ মতিন জানিয়েছেন“।
ময়না গ্রামের ভোটারদের মধ্যে শুধুমাত্র মহম্মদ মতিনের নামাই ভোটার থালিকা থেকে ’ডিলিট’ হয়েছে,এমনটা অবশ্য নয়। পেশায় স্কুল শিক্ষক মতিনের ছোট ছেলে মহম্মদ আসিফ জানান,“তাঁর মা রেজিনা বেগম, কাকিমা কাজী ওবায়দাতুল্লাহ ও খুড়তুতো দাদা আব্দুল বসিতের নামও ’ডিলিট’ হয়েছে। এঁনারা ছাড়াও ময়না গ্রামের যে ২৪৯ জন ভোটারের নাম ’বিচারাধীন’ রাখা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে ২০৬ জন ভোটারের নাম ’ডিলিড’ হয়েছে’।
আক্ষেপ প্রকাশ করে মহম্মদ আসিফ বলেন,“আমি কমিশনের প্রতিনিধি হয়ে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ’ফাস্ট পোলিং’ অফিসারের দায়িত্ব পালন করবো। আথচ আমাকে জন্ম দেওয়া আমার বাবা ও মাকে “বৈধ’ ভোটারের স্বীকৃতি দিল না কমিশন।তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে ’ডিলিট’ করা হল!“
গ্রামবাসী মহম্মদ মামুর শেখ,আবদুস সামাদ-রা বলেন,“নির্বাচন কমিশন “আগ্রাসী“ মনোভাব নিয়ে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ময়না গ্রামের নয় শাতাধীক ভোটারের মধ্যে ২০৬ জন ভোটারের নাম ’ডিলিট’ করে দিয়েছে।এর বিচার তাঁরা দাবি করেছেন“।
যদিও এমনটা হওয়ার জন্য বিজেপির জামালপুর বিধানসভার প্রার্থী অরুণ হলদার সব দায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘাড়ে চাপিয়েছে।তিনি দাবি করেন,“মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর দল এসআইআর(SIR) শুরুর প্রথম থেকে বিরোধীতা করে গেছেন।এখনো তিনি প্রতি পদে পদে অসহযোগীতা করছেন। তার কারণেই ঘটেছে এইসব ঘটনা”।বিজেপি প্রার্থীর এই দাবি নস্যাৎ করেদিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী ভূতনাথ মালিক বলেন,“বিজেপির স্বার্থ পূরণের লক্ষ্য নিয়ে কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ করেছে। তার মাশুল আজ বাংলার সাধারণ মানুষকে গুনতে হচ্ছে।“







