আবহাওয়া দক্ষিণবঙ্গ শিক্ষা লাইফ স্টাইল স্বাস্থ্য ভ্রমন ধর্ম কৃষি কাজ ক্রাইম

র‍্যাগিং, রাজনীতি আর প্রতিবাদ— কেমন হল রাজের ‘হোক কলরব’?

krishna Saha

Published :

WhatsApp Channel Join Now

বাস্তব ও সাম্প্রতিক ঘটনাকে উপজীব্য করে ছবি বানাতে বাংলার অনেক পরিচালকই সাধারণত এগোতে চান না। রাজনৈতিক রং লেগে যাওয়ার আশঙ্কা বা অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের ভয় বিনোদন জগতে দীর্ঘদিনের। অথচ বাস্তবতা হল— চারপাশের প্রায় প্রতিটি ঘটনাই কোনও না কোনও ভাবে রাজনৈতিক তর্কে জড়িয়ে পড়ে, তা সে মিটিং-মিছিল হোক বা সংবাদমাধ্যমের পরিসর। এই কারণেই টালিগঞ্জে অনেক সময়েই ‘নিরাপদ দূরত্ব’ বজায় রাখার প্রবণতা দেখা যায়। সেই চেনা প্রবণতার বাইরে গিয়ে নীরবতা ভাঙার চেষ্টা করেছেন রাজ চক্রবর্তী।

রাজের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। তা সত্ত্বেও কয়েক বছর আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে (ছবিতে যদুপুর) প্রথম বর্ষের এক ছাত্রের র‍্যাগিংয়ের জেরে মৃত্যুর ঘটনা, তার পর রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ছাত্র আন্দোলন ও জনরোষ—এই সংবেদনশীল বিষয়কেই তিনি ছবির কেন্দ্রবিন্দু করেছেন। সেই ঘটনার তদন্তে পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে যে গড়িমসির অভিযোগ উঠেছিল, তা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়েছে। দোষীদের শাস্তি আদৌ কতটা কার্যকর হয়েছে, সে প্রশ্ন আজও পুরোপুরি মেটেনি।

ছবির শুরুতেই পরিচালক স্পষ্ট করে দেন, “সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই ছবির গল্প ভেবেছন তিনি।” চিত্রনাট্য রচনার ক্ষেত্রে ফিল্মিক স্বাধীনতা নেওয়া হয়েছে—এই কথাও আড়াল করেননি সৌভিক ভট্টাচার্য। ছবির শেষে জানিয়ে দেওয়া হয়, পাশবিক র‍্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে ‘হোক কলরব’—এই প্রতিবাদ থামার নয়।

নির্মাণের দিক থেকে ছবিটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থ্রিলারের আবহ বজায় রেখেছে। সৌভিকের চিত্রনাট্য ও রাজের পরিচালনায় চরিত্র এবং ঘটনার বিন্যাস ধাপে ধাপে এগিয়েছে। মানস গাঙ্গুলির ক্যামেরা শুধু ছাত্রাবাসের অস্থিরতা, মিছিল বা থানা ঘেরাওয়ের দৃশ্যেই থেমে থাকেনি; ছাত্রনেতাদের ভূমিকা ও র‍্যাগিংয়ের নেপথ্যের মানসিকতাও তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। কোনও রাজনৈতিক দলের পতাকা সরাসরি দেখানো না হলেও, শরীরী ভাষা ও নির্দিষ্ট কিছু দৃশ্যের মাধ্যমে ছাত্র সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে ছিল, তা ইঙ্গিতে স্পষ্ট করা হয়েছে। এই সূক্ষ্ম বর্ণনাভঙ্গিই ছবির অন্যতম শক্তি।

See also  প্রকৃতি পূরণ

তদন্তে যুক্ত পুলিশ অফিসার ক্ষুদিরাম মাঝি (শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়) ও ছাত্রদের মুখোমুখি হওয়া, জিজ্ঞাসাবাদের দৃশ্যগুলো সংলাপের জোরে দর্শককে একদিকে কৌতূহলী করে তোলে, অন্যদিকে উত্তেজনাও বাড়ায়। এই জায়গাতেই ‘হোক কলরব’ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে সক্ষম। ছবিটি শেষ পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলন বা রাজনীতিকে খারিজ না করে, সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশে ছাত্রসমাজ এগোনোর বার্তাই দেয়।

অভিনয়ের দিক থেকেও ছবিটি প্রশংসনীয়। একঝাঁক তরুণ ও তুলনামূলক নতুন মুখ চরিত্রগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। গৌরব, অর্ঘ্য, ফারহান, সৌম্য, অসিত ও মনোতোষের চরিত্রে জন ভট্টাচার্য, আকাশ, ওম সাহনি, দেবদত্ত, পুষণ ও সামিউল আলম প্রত্যেকেই আন্তরিকতা দেখিয়েছেন। ছোট দুটি নারী চরিত্রেও শ্রেয়া ও অভিকার উপস্থিতি মানানসই। এমন শক্তপোক্ত এনসম্বল কাস্টিং সাম্প্রতিক বাংলা ছবিতে খুব বেশি চোখে পড়ে না।

সবচেয়ে উজ্জ্বল অবশ্যই শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়। পুলিশ অফিসার ক্ষুদিরামের ভূমিকায় তিনি আবারও নিজের অভিজ্ঞতা ও দখলের ছাপ রেখেছেন। তাঁর দুই সহকারী চরিত্রে পার্থ ভৌমিক ও রোহন যথাযথ সঙ্গত করেছেন। যদিও ক্ষুদিরাম ও তাঁর স্ত্রীর সম্পর্কের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত আরও খানিকটা বিস্তৃত হলে চরিত্রটি হয়তো আরও গভীর হতে পারত।

ছবির সঙ্গীত পরিচালনায় একাধিক শিল্পী যুক্ত থাকলেও আলাদা করে কার অবদান কোথায়, তা স্পষ্ট করা হয়নি। তবুও একটি লাইন গোটা ছবির বক্তব্যকে ধরে রাখে—
‘শৃঙ্খলা এনে দিতে পারে প্রতিকার/নাশকতা করা আর নয় দরকার..’

সব মিলিয়ে, ‘হোক কলরব’ কেবল একটি ছবি নয়; বাংলার ছাত্র রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সময়কে নথিভুক্ত করার প্রয়াস। সেই লক্ষ্যপূরণে ছবিটি অনেকটাই সফল।

krishna Saha

আমার নাম কৃষ্ণ কুমার সাহা, আমি ফুল টাইম সাংবাদিকতা করি।গত ৮ বছর ধরে এই পেশায় আছি