আইনের প্রবাদপুরুষ ও মহান দানবীর স্যার রাসবিহারী ঘোষ মহাশয়ের ১৮১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তোড়কোনা গ্রামের পদ্ম পুকুর ফুটবল ময়দানে আয়োজিত স্যার রাসবিহারী ঘোষ স্মরণে সাংস্কৃতিক ও কৃষি মেলা আবেগঘন পরিবেশে সম্পন্ন হল। ২৩শে ডিসেম্বর ২০২৫, মঙ্গলবার শুরু হওয়া এই মেলা ২৮শে ডিসেম্বর, রবিবার পর্যন্ত চলেছে। এবছর এই ঐতিহ্যবাহী মেলা ২৭তম বর্ষে পদার্পণ করল।
মেলার প্রথম দিন দুপুর দু’টো নাগাদ এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে মেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। শোভাযাত্রায় গ্রামীণ সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য ও স্যার রাসবিহারী ঘোষের স্মৃতিচিহ্নে ভর করে তৈরি হয় এক অনন্য আবহ। সন্ধ্যা ঘনাতেই মেলার মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট শিল্পী গুরুজিৎ সিং। তাঁর সুরেলা গানে উদ্বোধনী রাতেই প্রাণ ফিরে পায় মেলার মঞ্চ।
পরবর্তী দিনগুলিতেও একের পর এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দর্শকদের মন জয় করে নেয় মেলা। ২৪শে ডিসেম্বর রাত্রি ন’টায় জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী অদিতি চক্রবর্তী তাঁর কণ্ঠে উপহার দেন মন ছুঁয়ে যাওয়া গান। ২৫শে ডিসেম্বর দর্শকদের আনন্দ দিতে মঞ্চে উপস্থিত হয়ে আপন করে নেন চলচ্চিত্র অভিনেতা কৌশিক ব্যানার্জি। ২৬শে ডিসেম্বর শুক্রবার মেলার মঞ্চ মাতান জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী রাফা ইয়াসমিন।
সংস্কৃতির পাশাপাশি সমাজের দায়বদ্ধতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় এই মেলায়। ২৭শে ডিসেম্বর শনিবার সকাল ন’টা নাগাদ অনুষ্ঠিত হয় একটি স্বেচ্ছা রক্তদান শিবির, যেখানে বহু মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। একই দিনের রাত্রি ন’টায় দর্শকদের আনন্দ দিতে মঞ্চে হাজির হন চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তি অভিনেত্রী শ্রাবন্তী চ্যাটার্জী। তাঁর উপস্থিতিতে উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ।
মেলার শেষ দিন ২৮শে ডিসেম্বর রবিবার বিকেলে পরিবেশিত হয় আবেগমথিত বাউল গান। শিল্পী শুভঙ্কর ঘোষ সম্প্রদায়ের পরিবেশনায় লোকসংগীতের সুরে মুগ্ধ হন দর্শকরা। সন্ধ্যার পর অনুষ্ঠিত হয় যাত্রাপালা— “শ্মশানের বুকে সূর্যমুখী”। আনন্দ বাসর অপেরার পরিচালনায় মঞ্চস্থ এই যাত্রায় শ্রেষ্ঠাংশে অভিনয় করেন তাপসী মুন ও রাজু বড়ুয়া। দীর্ঘ করতালি ও আবেগঘন প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্মরণীয় পরিসমাপ্তি ঘটে মেলার।
মেলা প্রসঙ্গে স্যার রাসবিহারী ঘোষ স্মৃতি রক্ষা কমিটির সম্পাদক পঞ্চানন দত্ত বলেন,
“স্যার রাসবিহারী ঘোষ শুধু একজন মহান আইনবিদ নন, তিনি ছিলেন মানুষের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়া এক অনন্য দানবীর। এই মেলার মাধ্যমে আমরা তাঁর আদর্শ, মানবিকতা ও সমাজসেবার বার্তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। মানুষের ভালোবাসা ও অংশগ্রহণেই এই মেলা আজও যাকজমকের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে”।
মেলা কমিটির সভাপতি শ্যামল কুমার দত্ত বলেন, “এই মেলা শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি আমাদের আবেগ, ঐতিহ্য ও দায়বদ্ধতার প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্যার রাসবিহারী ঘোষের স্মৃতি ও আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখাই আমাদের লক্ষ্য। এলাকার মানুষ যেভাবে এই মেলাকে আপন করে নিয়েছেন, তাতেই আমাদের সব পরিশ্রম সার্থক”।
মেলা কমিটির সম্পাদক রিপন মুন্সী জানান, “এই মেলার সফল আয়োজনের পিছনে স্থানীয় মানুষ, স্বেচ্ছাসেবক ও শিল্পীদের সম্মিলিত প্রয়াস রয়েছে। সকলের সহযোগিতাতেই এত বছর ধরে এই মেলা সাফল্যের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভবিষ্যতেও স্যার রাসবিহারী ঘোষের আদর্শকে সামনে রেখে আরও বৃহৎ পরিসরে এই মেলার আয়োজন করার চেষ্টা থাকবে”।
স্যার রাসবিহারী ঘোষের প্রতিষ্ঠিত তোড়কোনা জগবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ও বহন করে চলেছে তাঁর স্মৃতি ও আদর্শ। সেই স্মৃতিবিজড়িত বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সৌমেন কুমার চৌধুরী মেলা প্রসঙ্গে বলেন, “স্যার রাসবিহারী ঘোষ ছিলেন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই মেলা নতুন প্রজন্মকে তাঁর জীবনদর্শন, মানবিকতা ও শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। বিদ্যালয় ও সমাজ—এই দুইয়ের মধ্যে যে সেতুবন্ধন, তা আরও দৃঢ় করতেই এমন আয়োজন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়”।








